আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক ও জীবনযাত্রাগত বিশ্লেষণ - 

ডঃ পলাশ চন্দ্র কুমার

ভূমিকা:

        আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের তফসিলি উপজাতিদের (Scheduled Tribes) জীবন, সংস্কৃতি এবং তাদের সম্মুখীন হওয়া গুরুতর সমস্যাগুলির একটি বিস্তৃত নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো। এই উপজাতিগুলি, বিশেষত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীরা, বর্তমানে বিলুপ্তির পথে থাকা বিশ্বের অন্যতম আদিম মানবগোষ্ঠী।

১.  ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক শ্রেণীবিভাগঃ-

        আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ 9^\circ থেকে 10^\circ উত্তর অক্ষাংশ এবং 92^\circ থেকে 94^\circ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। মোট ৫৭০টি দ্বীপের মধ্যে মাত্র ৩৬টিতে জনবসতি রয়েছে। এখানে বসবাসকারী ৬টি প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠীকে তাদের উৎস ও অবস্থানের ভিত্তিতে দুটি মূল ধারায় ভাগ করা হয়:

নেগ্রিটো জনজাতি (আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ)

        ধারণা করা হয় এরা প্রায় ৬০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে এসেছিল এবং মূলত যাযাবর শিকারী-সংগ্রাহক। এদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য হলো খর্বাকৃতি (Pygmy-like stature), কোঁকড়ানো চুল, মোটা নাক এবং পুরু ঠোঁট।

গোষ্ঠী

অবস্থান ও অবস্থা

প্রধান সমস্যা

গ্রেট আন্দামানীজ

বর্তমানে স্ট্রেইট আইল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেছে।

জনসংখ্যা হ্রাস (বিলুপ্তির পথে), সাংস্কৃতিক পরিচিতি হারানো (বর্তমানে বেশিরভাগ হিন্দি বলে)।

ওঙ্গে

লিটিল আন্দামানের ডুগং ক্রিক-এর কাছে। আধা-যাযাবর।

পুরুষদের মধ্যে মদ্যাসক্তি জনিত কারণে মৃত্যু।

জারোয়া

মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামানের পশ্চিম উপকূলের গভীর জঙ্গল।

আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং চরম শত্রুতা।

সেন্টিনেলিজ

উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ।

সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। পৃথিবীর একমাত্র বেঁচে থাকা প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী।

 মঙ্গোলয়েড জনজাতি (নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ)

            সম্ভবত কয়েক হাজার বছর আগে মালায়-বার্মা উপকূল থেকে এরা এসেছিল। এদের বৈশিষ্ট্য হলো ফর্সা গায়ের রং, সোজা চুল, চ্যাপ্টা নাক এবং এপিগ্যানথিক ফোল্ড।

গোষ্ঠী

অবস্থান ও অবস্থা

প্রধান সমস্যা

শোম্পেন

গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। লাজুক এবং নদী উপত্যকা বরাবর বাস করে।

রোগের শিকার এবং শারীরিক দুর্বলতা; যোগাযোগের ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।

নিকোবোরিজ

১২টি নিকোবর দ্বীপ।

তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল; শোম্পেনদের সাথে অস্বাস্থ্যকর আন্তঃ-উপজাতীয় সম্পর্ক বিদ্যমান।

২. জনসংখ্যা হ্রাস ও বিলুপ্তির সঙ্কট

        আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের জনসংখ্যা বিপর্যয়করভাবে হ্রাস পেয়েছে। এটি প্রবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং হৃদয়বিদারক তথ্য।

আদিবাসী গোষ্ঠী

১৯১১ (মোট জনসংখ্যা)

১৯৮১ (মোট জনসংখ্যা)

২০১১ (মোট জনসংখ্যা)

হ্রাস/বৃদ্ধি

গ্রেট আন্দামানী

৬২৫

২৮

৪৪

৯৬% এরও বেশি হ্রাস

ওঙ্গে

৬৭২

১০৪

১০১

ব্যাপক হ্রাস

শোম্পেন

৬০০

২০

২২৯

ব্যাপক হ্রাস ও কিছুটা স্থিতিশীলতা

নিকোবরী

৮,৫০০

২৯,৯৬৭

২৭,১৬৮

উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি

বিলুপ্তির চূড়ান্ত উদাহরণ:

        গ্রেট আন্দামানীজদের জনসংখ্যা ১৯১১ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ৬২৫ থেকে মাত্র ২৮-এ নেমে আসে, যা ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপন এবং 'অ্যাবারডিন যুদ্ধ'-এর মতো সংঘাত ও রোগ সংক্রমণের সরাসরি ফল।

৩.  বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহ

        আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের বিলুপ্তির এই ধারাটি বহির্জগতের প্রভাবে সৃষ্ট একটি সাংস্কৃতিক ও জনমিতিগত বিপর্যয়। প্রধান কারণগুলো হলো:

ক. রোগের সংক্রমণ ও স্বাস্থ্য সমস্যা

        আদিবাসীদের মধ্যে বাইরের রোগের (যেমন: সিফিলিস, যক্ষ্মা/টিউবারকুলোসিস, ম্যালেরিয়া, ব্রঙ্কিয়াল-পালমোনারি রোগ) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তা মহামারীর আকার নেয়। এটিই শিশুমৃত্যুর হার (Infant Mortality Rate) এবং সামগ্রিক জন্মহার হ্রাসের প্রধান কারণ।

খ. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবক্ষয়

 * নেশা ও মদ্যপান: ওঙ্গে পুরুষদের মধ্যে মদ্যাসক্তি একটি গুরুতর সমস্যা, যা মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

 * বিবাহ বিচ্ছেদ ও বাল্য বিবাহ: আদিবাসী সমাজে এই ধরনের সমস্যা নিম্ন জন্মহার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য দায়ী।

 * ভাষাগত পরিচিতি হারানো: গ্রেট আন্দামানিজরা তাদের নিজস্ব ভাষা হারিয়ে এখন হিন্দি বলতে অভ্যস্ত।

গ. খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন

        আদিবাসীরা এখন শিকার, মাছ ধরা ও ফল-মূল সংগ্রহের চিরাচরিত পদ্ধতি ছেড়ে সরকারের সরবরাহ করা বিনামূল্যে খাদ্যের (চাল, ডাল, চিনি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এটি তাদের পুষ্টির ভারসাম্যতা নষ্ট করেছে।

ঘ. প্রতিকূল সরকারি উদ্যোগ

        আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড, যা জারোয়াদের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে গেছে, তা তাদের অস্তিত্বের জন্য জীবন-হুমকিস্বরূপ, এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও এটি চালু আছে।

৪.  নিকোবরীজদের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা

      নেগ্রিটো উপজাতিদের তুলনায় মঙ্গোলয়েড নিকোবরীজদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তারা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে (নারকেল, সুপারি, কলার চাষ) রূপান্তর ঘটিয়েছে এবং কিছু চাকরিও করে। এদের যৌথ পরিবার প্রথাকে তুহ্যাট (Tuhet) বলা হয়। স্বাস্থ্যকর বহিরাগত প্রভাব এবং নিজস্ব উদ্যোগের কারণে এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন স্থিতিশীলতা আনতে পারে।


        স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, জারোয়াদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে এবং ক্ষতিকারক উদ্যোগের পক্ষে বৈজ্ঞানিক নীতিকে অবহেলা করা অব্যাহত রয়েছে। এই আদিম গোষ্ঠীগুলির বিলুপ্তি রোধে আরও সংবেদনশীল এবং সুচিন্তিত সংরক্ষণ নীতি অবিলম্বে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 -   সমাপ্ত   -