ঝালং বিন্দু গরুমারা ভ্রমণ

জয়দেব সেন গুপ্ত

        শক্তি'র ছেলের বৌভাত ছিলো ১১ ই নভেম্বর ২০২৪। জায়গাটা শিলিগুড়ি। শক্তি, আমার গিন্নির ভাই এর থেকেও বেশি, শিলিগুড়িতে থাকে। অপর্ণার বাবা যখন শিলিগুড়ি ‘স মিলে,  চাকরি করতেন, ১৯৮০ র কাছাকাছি, তখন থেকে পরিচয়।  আমরা বৌভাত এর দিন অর্থাৎ ১১ ই ডিসেম্বর ২০২৪ এ সকাল এ শিলিগুড়ি তে পৌছালাম। আমরা মানে আমি ও অপর্ণা। 

    আমার ছোট শ্যালক অনুপমও ছিলো ওখানে সেই সময়। আমরা একটি গেস্ট হাউস উঠলাম, চানা পট্টি হিলকার্ট রোড। শক্তি দে’র আরও অনেক আত্মীয়রাও ওই গেস্ট হাউসেই ছিলেন। ওই গেস্ট হাউস এর কাছেই শক্তি দে’র বাড়ি। সারা দিন অনুষ্ঠান বাড়িতে কাটিয়ে রাতে হিলকার্ট রোড এ ফিরে এলাম। 

        ১২ই ডিসেম্বর, সকাল ৮ টা তে বিকাশের গাড়ি চলে এলো। আমরা দুজন গাড়ি তে উঠে পড়লাম মানে আমি আর অপর্ণা। প্রথম গন্তব্য স্থান ঝালং।  NH১৭ ধরে চালসা মোড়ে যাওয়া হলো। সেখানে ব্রেকফাস্ট এর জন্য গাড়ি দাঁড় করানো হলো। ব্রেকফাস্ট এর পর গাড়ি চলতে শুরু করলো নাগরাকাটার অভিমুখে। কিছু সময় পর এলো খুনিয়া মোড়। খুনিয়া মোড় হলো  জঙ্গলের বাইরে পূর্ব ও পশ্চিম ডুয়ার্স এর সংযোগস্থল। খুনিয়ার বাইরে রয়েছে খুনিয়া বস্তি যেটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া। এরপর উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা শুরু হলো ও ঢুকে পড়লাম চাপড়ামারি রেঞ্জে।


        চাপড়ামারী রেঞ্জ, চাপড়ামারী ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্‌চুয়ারি’র অংশ, যেখানে রয়েছে ডুয়ার্স এর ঘন জঙ্গল।  রাস্তা শুরু হলো। দুপাশে চাপড়ামারী রেঞ্জ এর ঘন জঙ্গল। জায়গায় জায়গায় এলিফ্যান্ট করিডর এর মার্কিং দেখতে পাচ্ছিলাম। ভোর বা সন্ধের আগে হাতি পারাপার এর সম্ভাবনা খুব বেশি। আমরা ঘড়ি দেখলাম সকাল সাড়ে দশটা। কত রকম পাখির আওয়াজ, রাস্তার ধারে বাঁদরদের মিটিং চলছে, একটা অদ্ভুত জঙ্গলের গন্ধ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখলো। 

        চাপড়ামারী শব্দটা এসেছে চাপড়া ও মারী থেকে, চাপড়া মানে নানা ধরণের ছোট মাছ যা নদী তে থাকে, মারি মানে প্রচুর। চাপড়ামারী হলো গরুমারা ন্যাশনাল পার্কে’র এক্সটেনশন। জঙ্গলে রয়েছে হাতি, বাইসন, লেপার্ড, নানা ধরণের হরিণ, অজস্র পাখি। যদিও NH ৩১ কিন্তু বৃহত্তর NH ১৭ এর অংশ। আমরা চাপড়ামারী ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলাম। চাপড়ামারী জঙ্গলের মূল প্রবেশের গেট চালসা থেকে প্রায় ৩০ কি মি দূরে। জঙ্গল এখন খোলা, বন্ধ থাকে ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর।

        চাপড়ামারী কে ছুঁয়ে যখন আমাদের গাড়ি পিচ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখছিলাম বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার যাচ্ছিল। চোখে পড়ল শিলিগুড়ি তেনজিং নোর্গে থেকে ঝাঁলং এর বাস, তবে কতটা নিয়মিত সেটা জানা নেই। চোখে পড়ছিলো দুপাশের ঘন জঙ্গল, মাঝে মাঝে চা বাগান। ঘন্টাখানেক এর মধ্যে পৌছে গেলাম ‘কুমানি’ যেটা কিনা বৃহত্তর ডুয়ার্স এর অংশ। নিকটে ভুটান বর্ডার, মুর্তি নদী, চোখে পড়ছিলো ঘন জঙ্গল, চা বাগান। কুমানি তে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এর কটেজ আছে, রবার গাছের চাষ হয়, এছাড়া হর্নবিল দেখার ভালো জায়গা। কুমানি খুনিয়া বস্তি থেকে প্রায় ৩৫ কিমি। এর প্রায় পাঁচ কিমি পর এলো নক্সাল ব্রিজ। নক্সাল ব্রিজ কালিম্পঙ জেলার অন্তর্গত। এই নক্সাল ব্রিজ নক্সাল আক্রমণ এর লক্ষ ছিলো, পাশাপাশি সরকার থেকে  রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণ এর কাজ চালু ছিলো। নক্সাল ব্রিজ থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো ঝালং এর দিকে, প্রায় সাত কিমি দূর।

        একটু কাছে পার্ক করাই ভালো, গাড়িকে ঝাঁলং মার্কেটের কাছাকাছিই রাখা হল। শান্ত গ্রাম, দূরে হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে জলঢাকা নদী, আর কাছেই রয়েছে ইন্দো ভুটান বর্ডার। ঝালং নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক এর এন্ট্রি পয়েন্ট। কাছাকাছি রেল স্টেশন নিউ মাল জংশন। বিরাট বাজার দেখলাম যেখানে ক্রেতা বাঙালি, মারওয়াড়ি, আদিবাসী, নেপালি ও ভুটানিরা। প্রচুর দোকানে দেখলাম বড় সাইজ এর ভুটানি চকলেট, নানা ফ্লেভার এর ও তার সাথে কিউরিও। আমরা ও অনেক কিছু কেনাকাটা করলাম সেখান থেকে। পরের গন্তব্য স্থল বিন্দু।

        বিন্দু, কালিম্পঙ জেলার অন্তর্গত, ঝাঁলং থেকে ১০কিমি দূরে, যেতে লাগলো ৩০ মিনিট। রাস্তা উঁচু, পাহাড়ি, মাঝে মাঝেই পড়ছিলো শার্প বেন্ড। বিন্দু পৌঁছে দেখলাম বহু নিচে একটা ভিউ পয়েন্ট আছে, যারা নিচ থেকে উঠে আসছে বলল নামতে ও উঠতে এক ঘন্টার উপর লাগল। আমরা দুজন এটা পারবো না তাই ঠিক করলাম হোটেলে আগে লাঞ্চ করে নেবো।  তারপর ই ঘটলো এক ঘটনা।

        যে কটি খাবার দোকান ছিল সেগুলোতে লোক উপচে উঠছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। একটি দোকানের বাইরে লাইন দিলাম, একটু পরে খেয়াল করলাম লোকেরা বসে আছে, কোথাও কোনো খাবার নেই। মানে খাবার তৈরী হচ্ছে কিচেনে। এক ঘন্টা পর সেই হোটেল ফাঁকা হলো, অর্ডার দিতে গিয়ে শুনলাম সব খাবার শেষ। ভাত নেই ডাল নেই ভাজি নেই সবজি নেই ডিম নেই। অগত্যা বিস্কুট কিনে রকি আইল্যান্ড এর পথে রওনা হলাম।

        বিন্দু থেকে রকি আইল্যান্ড এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিমি, গাড়িতে লাগলো আন্দাজ দেড় ঘন্টা। রাস্তা মোটামুটি ভালোই ছিলো। ডুয়ার্স এর চা বাগান, জঙ্গল ও মূর্তি নদী কে দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম। রকি আইল্যান্ড এর ভেতরে রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিং, ক্যাম্পিং এর সুবিধা আছে। এটাও কালিম্পঙ জেলার অন্তর্গত।

        রকি আইল্যান্ড থেকে ৩ কিমি দূরে সুনতালেখোলা।  আমাদের লোকাল ট্রেকার নিতে হয়েছিল নিজেদের আলাদা গাড়ি থাকা সত্ত্বেও। এটাই ওখানকার জোর জুলুম। সুনতালেখোলা সামসিং হিল এলাকার অন্তর্গত, নিকটে মূর্তি নদী, মনভোলানো চা বাগানের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। এখান থেকে যাওয়া যায় নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। সুনতালে মানে কমলালেবু ও খোলা মানে স্রোত। এখানে রয়েছে  WBFDC-র বাংলো ও বেশ কিছু হোমস্টে। জঙ্গল, চা বাগান ও জলের স্রোতের বরাবর হাটতে খুব ভালো লাগে। সুনতালেখোলা নদীর ওপরে রয়েছে বিখ্যাত হ্যাঙ্গিং ব্রিজ।  নদীর ধারে টেন্টের ব্যবস্থা আছে। বর্ষার পর এই এলাকার সৌন্দর্য দেখার মতো। প্রকৃতি প্রেমিকরা এখানে পাবেন অনেক ধরণের পাখি ও নানা ধরনের প্রজাপতি।

        এবার সুনতালেখোলা থেকে রাহুতবাড়ি গরুমারাতে ফেরা। সুনতালেখোলা থেকে রওনা হলাম বিকেল সাড়ে পাঁচ’টা নাগাদ, আমরা গেছিলাম ৭৫০ মিটার উচ্চতায়। সামসিং এর দিকে মেইন রোড ধরা হল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রাহুতবাড়ি পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগল। 

        রাহুতবাড়ি, গরুমারা কোর এরিয়ার একটি নিকটবর্তী গ্রাম। ওর ভেতরে আমাদের হোমস্টে’তে বুকিং ছিলো যার পরিচালনা তে ছিলেন অমল রাউত। আমরা হোমস্টে’তে পৌঁছলাম প্রায় সন্ধে সাত’টা নাগাদ। অমল বাবু আমাদের জন্য হোমস্টে’র সামনে অপেক্ষা করছিলেন। অমল বাবু আমাদের জন্য হাতিতে ওঠার বুকিং ও করেছিলেন। দুদিনের জন্য, মানে ১৩ তারিখ ভোর বেলায় ও ১৩ তারিখ বিকেলে। অমল বাবুর মতো এতো উপকারী বন্ধু বাইরে এসে পাওয়া  ভাগ্যের ব্যাপার। ভালো ঘর ছিলো।  অ্যাটাচড বাথ, বেশ বড় ও পরিচ্ছন্ন। রাত নটা’তে ডাক পড়লো ডিনারের, দেখলাম খাবার টেবিল এর সামনে অমল বাবু দাঁড়িয়ে আছেন, এটাই ওনার রীতি, উনি দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে খাওয়ান। রাহুতবাড়ি সহ সমস্ত জায়গার বুকিং রেফারেন্স আমায় দিয়েছিলেন আমার এক বন্ধু পীযুষ কুন্ডু যিনি  আমাদের বাড়ির কাছে CIT কোয়ার্টার এ থাকেন।

        ১৩ ই ডিসেম্বর ভোর পাঁচটার সময় বিকাশ গাড়ি নিয়ে হাজির। গাড়িতে ওঠার আগে দেখতে পেলাম গেস্ট হাউসের এর ভেতর মা মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর পেছনে অজস্র মুরগির বাচ্চারা। আমরা বেরিয়ে পড়লাম ধূপঝোরা এলিফ্যান্ট স্টার্টিং পয়েন্ট এর দিকে। প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগল ধূপঝোরা। পাস দেখিয়ে হাতিতে ওঠার পারমিশন হোলো। সমস্যা হোলো হাতিতে ওঠার সময়। দেখলাম হাতিতে কোনো হাওদা নেই। হাতির দু দিকে পা ঝুলিয়ে বসা, ধরার জন্য শুধু একটা দড়ি। দুটো দড়ি ছিলো, আগে বসেছে অপর্ণা পেছনে আমি একই হাতির ওপর। অপর্ণার আগে মাহুত,আমার হাতে বিশাল ক্যামেরা, ক্যামেরা ধরবো না দড়ি ধরবো। যখন হাতি চলতে শুরু করলো প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম হাতি এতো দুলছে, হাতির দড়ি ধরে থাকলে ক্যামেরা ধরা যাচ্ছে না আর ক্যামেরা ধরতে গেলে মনে হচ্ছে হাতির ওপর থেকে পরে যাবো। তাই ঠিক করলাম ছবি তুলবো না, আগে প্রাণ বাঁচাতে হবে। দড়িটা হাতির সাথে  অদ্ভুত ভাবে বাধা, শুড়ের গোড়া থেকে ঘুরিয়ে  শরীরে আরাআড়ি দুই প্যাচ ও পেছনে লেজের গোড়া থেকে ঘুরিয়ে আনা। হাতি গভীর জঙ্গলের পথ ধরেছে, বাঁ দিক ডান দিক শরীর নাড়ালেই গাছের পাতাতে লেগে যাচ্ছে, এর মাঝে এলো উঁচু নিচু রাস্তা তখনই মাথা থেকে টুপিটা পড়ে গেল। আমাদের মাহুত কেউ বললাম,  ও পেছনের মাহুত কে বললো তখন পেছনের হাতিটা টুপিটা তুলে আমাদের হাতিকে দিয়ে দিল। তখন অপর্ণা আর আমার মাঝে ক্যামেরা রেখে দিয়েছি আর দু হাতে শক্ত করে দড়ি ধরে আছি।

        লার্জ ইস্টার্ন ডুয়ার্স এলিফ্যান্ট রিজার্ভ প্রায় আয়তনে ৯৭৭ স্কোয়ার কিমি ও গরুমারা তার একটা অংশ যা আয়তনে ৮০ স্কোয়ার কি.মি. কোর এরিয়া। গরুমারা শাল, শিরিশ, শিমুল টিক এর জঙ্গল যার মধ্যে রয়েছে বিরাট গ্রাসল্যান্ড যেটা রাইনোদের চারণ ভূমি। গরুমারার ওয়াইল্ড লাইফ বলতে হাতি, এক শৃঙ্গ গন্ডার, লেপার্ড, বাইসন, গাউর, বিভিন্ন হরিণ যেমন চিতল, সম্বর, বার্কিং ডিয়ার, হগ ডিয়ার ইত্যাদি। এছাড়াও মাঝে মাঝে দেখা যায় স্লথ বিয়ার, ওয়াইল্ড বোর্, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ইত্যাদি। প্রচুর ও নানা জাতের পাখির আওয়াজে মুখরিত। এই হাতিতে বসার নিয়ম আছে। হাতি যখন নিচের দিকে নামছে, তখন পেছনে হেলিয়ে বসতে হয়, আর যখন ওপর দিকে উঠছে তখন সামনে ঝুঁকে বসতে হয়। এই সময় আমাদের মাহুত দেখল অনেক দূরে ডান দিকে একটি হাতি দাঁড়িয়ে, মাহুত জানালো ওই দিকে গন্ডার বেরিয়েছে,তাই আমাদেরও ওই দিকে যেতে হবে।

 লেপার্ডে'র পায়ের ছাপ 

        এর পর ই আমার বুক কেঁপে গেলো, দেখলাম  হাতি অনেক নিচের দিকে নামছে ও তারপর একটা জলাশয়। পেছন দিক করে অনেকটা হেলিয়ে বসলাম, হাতি নিচে নেমে জলাশয় পেরোতে শুরু করলো। পরের দৃশ্য দেখে দূর্গা নাম জপতে শুরু করলাম। হাতি বেশ উঁচু একটা টিলা তে উঠতে শুরু করলো, হাতির পিঠে মুখ গুঁজে নিচু হয়ে বসে রইলাম। বেশ কিছুটা সময় লাগল হাতির টিলাতে উঠতে। টিলাতে উঠেই একটু নিচু ফ্ল্যাট ল্যান্ড। হাতি ওই রাস্তা ধরতেই দেখলাম ডানদিকে একটি বুনো শুয়োর দাঁড়িয়ে, আমাদের দেখে পাশের গ্রাসল্যান্ডে ঢুকে গেলো। এইবার দেখলাম দুটি হাতি টুরিস্ট নিয়ে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে ওখানে কিছু একটা দেখেছে। কিছু সময়ের মধ্যে আমাদের হাতিটি ওখানে পৌঁছে গেলো। দেখলাম একটি পূর্ণবয়স্ক গন্ডার দাঁড়িয়ে আছে, হাতিও দাঁড়িয়ে পড়লো। এর পরে কয়েকটা ছবি নিলাম। তখনি ডানদিকের ঝোপটা নড়ে উঠলো, দেখলাম একটা বাচ্চা গন্ডার। আরো বেশ কিছু শট নিলাম। বেশ কিছু সময় ধরে পোজ দেওয়ার পর আস্তে আস্তে তারা গ্রাসল্যান্ড এর ভেততে ঢুকে গেলো। এরপর এগিয়ে কিছু পর দেখতে পেলাম সম্বর, আমাদের দেখেই ঝোপে ঢুকে গেলো। তারপর কিছু পরে দেখতে পেলাম দুটি ইন্ডিয়ান গাউর, ঘাসপাতা খাচ্ছে খুব হিংস্র। একটি বাইসন ঝোপ থেকে উঁকি মেরে ঢুকে গেলো। এরপর হাতি এতো ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেলো যে আমাদের গায়ে গাছের ডালপালা লেগে যাচ্ছিল।  এরপর হাতি টার্ন নিতেই দেখলাম আমাদের জার্নির স্টার্ট পয়েন্ট এসে গেছে। কিছু পরেই রাইডিং প্লাটফর্ম এসে গেলো ও হাতির পিঠ থেকে নেমে খুব আনন্দ লাগল যে একটা বড় বিপদ থেকে বাঁচলাম। আবার মনে হোলো যে বিকেলে আবার হাতির পিঠে চড়তে হবে, তাও একটা এক্সপেরিয়েন্স হয়ে গেলো সকাল বেলাতেই। এলিফ্যান্ট রাইড এর পর গাড়ি করে চলে এলাম সোজা মুর্তি নদীর ধারে ও চায়ের দোকান দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম।

        সকালের মুর্তি নদীর পাড় দারুন সুন্দর। আমরা একটা চায়ের দোকানে বসলাম। মুর্তি নদীর ওপারে ময়ূর পেখম মেলছে, সাদা বক নদীর জলের পাথরে বসে ডানা জাপটেচ্ছে, নদীতে জল কম। নদীর পাড় এতো সুন্দর যে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। নদীর সৌন্দর্য ব্যাঘাত না করে রাস্তার উল্টো দিকে কিছু দরমার তৈরী দোকান হয়েছে চা ও অন্যান্য খাবার এর জন্য। প্রায় এক ঘন্টা সময় কাটিয়ে রাহুতবাড়ির হোমস্টেতে ফিরে এলাম। সকালের জল খাবার খেয়ে কয়েক বিঘা জায়গার ওপর তৈরী বাগান ও চাষের ক্ষেতে ঘুরে বেড়ালাম রাহুতবাড়ির ভেতর। অনেক্ষন ঘুরে বেড়াবার পর চান খাওয়া দাওয়া করে নিতে হলো কেননা তিনটের পর আবার হাতিতে দ্বিতীয় বার উঠতে হবে। উল্লেখযোগ্য ভাবে অমলবাবু প্রতিটি খাওয়ার সময়ে আমাদের পাশে উপস্থিত ছিলেন।

        ১৩ তারিখ বিকেলে হাতির পিঠে সেরকম কিছু দেখা গেলো না, শুধুমাত্র একটি গন্ডার ঝোপ থেকে মুখ দেখিয়ে আবার ঢুকে পড়লো। বিকেলের ট্রিপ এ হাতির পিঠে ওঠার ভয় একটু কম লাগলো। এলিফ্যান্ট সাফারির পর আমরা বিকাশের গাড়ি নিয়ে সোজা মূর্তি নদীর পারে চলে এলাম। প্রায় দু ঘন্টা নদীর পারে ছিলাম, কি ভালোই লাগছিলো, অবশেষে গেস্ট হাউসে ফিরে এলাম কারণ জিনিসপত্তর গুছিয়ে পরদিন জলদাপাড়া যেতে হবে। ১৪ ই ডিসেম্বর সকালবেলা উঠে ব্রেকফাস্ট এর পর সোজা মূর্তি নদীর ধারে গেলাম ও কিছু সময় কাটানোর পর গরুমারা ও মূর্তি কে বিদায় জানিয়ে জলদাপাড়ার দিকে রওনা হলাম। চোখের কোন একটু ভিজে গেছিলো জানিনা আর কোনোদিন গরুমারা যাওয়া হবে কিনা।

–  সমাপ্ত –