আমার  ও আমাদের গ্রুপের কথা

অভিজিৎ দে

অনেক দিন ধরে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে আমাদের গ্রুপের  কথা বলার বা প্রকাশ করার একটা ম্যাগাজিন থাকা উচিত। সেই মত একটা মিটিংয়ে দীর্ঘ বাকবিতন্ডা'র পর প্রায় সবাই একমত হলাম যে স্কুলে যেমন দেয়াল পত্রিকা ছিল সেইরকম একটা কিছু হোক। অনেক টানাহ্যাঁচড়ার পর নাম ঠিক হলো "আবার চরৈবেতি"। 

     গ্রুপে প্রস্তাবটা দিয়েছিল প্রদীপ রায়, তাই প্রদীপ,অমলেশ ও গৌতম এদের উপরেই পরলো, ব্যাপার টা বাস্তবায়িত করার ভার। গৌতম এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিল ই-পাব্লিসিং এর পুরো ব্যাবস্থার।  

এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল কিন্তু আমি পড়লাম বেজায় ফ্যাসাদে। যখন সবাই চাপ দিতে লাগলো এই বলে যে দুই অ্যাডমিন লেখা দিচ্ছে, তাই আমাকেও কিছু একটা লেখা দিতে হবে। অথচ লেখা আমার কিছুই আসে না।

সুনীল ও আমার ছেলে রোহোন কয়েকটা বিষয় ও উপায় বলে ব্যাপারটা সহজ করে দিল। ঠিক হলো, আমি বলবো ছেলে লিখে দেবে।

     শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী, কলকাতা - এই নামে একটি এন  জি ওর  সাথে আমার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। বহুদিন ধরে প্রচুর সেবা মুলক স্বাস্থ্য শিবিরে এক সাথে কাজ করেছি। ঘটনা চক্রে আমাদের এই BRKMA 1973 Batch এর গ্রুপে এই রকম স্বাস্থ্য শিবির করার প্রস্তাব আমি প্রথম দিই। সেদিন অনেকেই উত্তম প্রস্তাব বলে স্বীকার করলেও আবার কারো কারো জিজ্ঞাসার দাপটে  ব্যাপারটা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল। আমি তখন বললাম,  ঔষধ ও ডাক্তার আনার দায়িত্ব আমি নিলাম শুধু জায়গা ঠিক করে প্রচারটা করতে হবে। তাহলেই একটা ফ্রী হেল্থ-ক্যাম্প করতে পারি আমরা। 'ঠিক আছে তালে বাকি ব্যবস্থা হয়ে যাবে' - সমস্বরে সবাই  উৎসাহ দেখালো।

     সময়টা ছিল ঘোর করোনা কাল। লকডাউনের দগদগে ঘা  তখনো চারদিকে সদা জাগ্রত। ভ্যাক্‌সিনের সাফল্যে চনমনে চারিদিকে। আজ মনে পড়লে ভীষণ কষ্ট হয়। ঐ  সময়ে  অমলেশের মা হঠাৎই মারা গেছে। আমরা কেউ কিছু করতে পারছি না, এমনকি শশ্মান যাত্রার জিনিসপত্র কেনার মত দোকানপাটও সেই সময় খোলা ছিল না। সেই সব দিনগুলো ভাবলেই এখনও শিহরণ জাগে। দূরভাষে আমাদের যোগাযোগ ছিল, তবুও প্রথম দেখা হয় যখন করোনা'র উৎপাতটা একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে। আমরা পরস্পরকে দেখলাম অনেক দিন পরে। আগের থেকে ফোনাফোনি করে, বরানগর পেট্রোল পাম্পের কাছে দেখা করলাম, মাস্ক পরে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে, সে দিন তারিখ টা ছিল ০৩-০২-২০২১লকডাউন হয়েছিল ২৫-০৩-২০২০, অর্থাৎ কম করে এক বছর পরে আমাদের আবার দেখা। অনেক অনেক আড্ডা হল। কতবার যে চা খেলাম তা আজ আর মনে পড়ে না, কিন্তু সাত দিনের মধ্যে একটা টি-পার্টি হবে এটা ঠিক করে ফেললাম। ১৩-০২-২০২১-এ দর্জিপাড়ায় রামুর ফাঁকা ফ্লাটে বিপুল উৎসাহে সেই টি-পার্টি নতুন স্পর্ধা জাগালো। পিকনিক করা হবে। সেটাও হলো সাত দিনের মধ্যে। সুশৃঙ্খল ফুর্তিতে আমাদের গ্রুপে উৎসাহ ও উদ্যোগের বান ডাকলো। এর পর প্রায়ই সিঁথির মোড়ে চা যোগে আড্ডা শুরু হল। খবর পেয়ে আরো অনেক '৭৩ ব্যাচে'র বন্ধুরা এসে জুটলোপ্রথম ও দ্বিতীয় ভ্যাকসিন নিয়ে, অনেকটা স্বাভাবিক জীবন ফিরছে, 2nd  & 3rd ওয়েভ-এর ভ্রুকুটি তখনও আছে, তার'ই মধ্যে মে মাসে বাংলার বুক কাঁপিয়ে এল ইয়াস নামক একটা প্রচণ্ড ঝড়। সেই ঝড় বাংলার সমুদ্র উপকূল এলাকা লন্ডভন্ড করে দিল। আমাদের চায়ের আড্ডায় অনেকবার আলোচনা হল যে রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র হয়ে আমাদের কিছু একটা করা উচিত। তারপরে মিটিং, প্ল্যানিং, ফান্ড তোলা, সে কি উৎসাহ উদ্দীপনা ! এক ধাক্কায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা জোগাড় হয়ে গেল। শুরু হলো মালপত্তর কেনা ও প্যাকিং। 

    ৩০০ জন কে সেই ত্রাণ-সামগ্রী দিতে লঞ্চ ভাড়া করে আমরা চলে গেলাম প্রত্যন্ত সুন্দরবনের বন্যা কবলিত অঞ্চলে। সেদিনের সেই টিমওয়ার্ক আজও মনে করায় যে এই বয়সে এসে আমরাও পারি। সত্যই  সবার মধ্যে এক পরিতৃপ্তির জোয়ার খেলে গেল ।

    এতো সব বলার  উদ্দেশ্য হলো, আমরা হেলথ-ক্যাম্পের উৎসাহ কোথা থেকে পেলাম তারই ভনিতা। এবার ফিরে আসি, আমাদের প্রথম হেলথ-ক্যাম্পের কথায়। আমি যোগাযোগ করলাম শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী, কলকাতা'র ডিরেক্টারের সাথে। উনি রাজি হয়ে গেলেন। আমরা কোমর বেঁধে নেমে পরলাম। অনেক খুঁজে পেলাম নবোদয় ক্লাব, এটা অবশ্য ব্যবস্থা করেছে অমলেশএর পর এক এক করে বরানগর থানা'র পারমিশন, লোকাল কাউন্সিলার'কে বলা, ব্যানার লেখা, একটা মাস্ক তৈরী করা, চা-জলযোগের ব্যাবস্থা ইত্যাদি সব। দিনটা ছিল ১০ আগষ্ট, সুন্দর এক টিম ওয়ার্কের নিদর্শন তৈরী করলো আমাদের গ্রুপ।  

     আমরা আশা করেছিলাম ৭০/৭৫ জন হবে কিন্ত ১০৫ জন কে শিবিরের পরিষেবা দেবার পর বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম। প্রেসার, সুগার টেষ্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রেসক্রিপশন এবং সেই অনুসারে এক মাসের ওষুধ প্রতি জনে অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছেশেষে ক্লাবের গেট বন্ধ করে দিতে হলো। আসলে 'করোনা' কালে অসুখ বিসুখ, হাসপাতাল ও ডাক্তারের কাছে যাওয়া যতটা পারে মানুষ বন্ধ রেখেছিল। তাই চিকিৎসা সেবায় এতো চাহিদাবরানগর থানার অফিসার-ইন-চার্জ শ্রী পাহাড়ি মহাশয় এবং ১২ নং ওয়ার্ডে'র কাউন্সিলর শ্রীমতী সঞ্চিতা মহাশয়া'র বক্তব্যে এই বিষয়টা আরো গভীর ভাবে আমরা অনুভব করলামআর সেই কারনেই দ্বিতীয় হেলথ-ক্যাম্পের স্থান নির্বাচন করলাম সব থেকে অবহেলিত এলাকা বরানগরের ১ নং ওয়ার্ড নিরঞ্জন সেন নগরে

     দ্বিতীয় ফ্রি হেলথ-ক্যাম্পের তারিখ টা ছিলো ২৭-১০-২০২১, অর্থাৎ প্রায় আরো দুমাস পরআমাদের পুরানো অভিজ্ঞতা অনুসারে সকল কাজ ঠিকঠাক মত হলেও এখানে একটু ত্রুটি হয় ডাক্তার  আসতে দেরি করার কারণে। আমাদের ক্যাম্পের জন্য যে ডাক্তার আসবেন ঠিক ছিল তিনি বিশেষ প্রয়োজনে আটকে পরায়, নতুন ডাক্তার পাঠায় শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী সেন্টার থেকে। নিরঞ্জন নগরের স্কুলের নাম ছিল যতীন্দ্র বিদ্যাপীঠ আর  স্কুলের হেড দিদিমনি ছিলেন খুবই কো-অপারেটিভস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের উনি আগেই বলে রেখেছিলে্‌ ফলে সকলের সহযোগীতায় আমাদের এই স্বাস্থ্য শিবির খুব ভালো ভাবে সুসম্পন্ন হয়।   

    উল্লেখযোগ্য বিষয় আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি শ্রী শ্যামল ভট্টাচার্যি মহাশয় আমাদের ব্যাচের সেবামূলক কাজ শুনে নিজেই হাজির হয়েছিলেন এই স্কুলেএই স্বাস্থ্য শিবিরে স্কুলের বড়-দিদিমনি'র কথা বিশেষ করে উল্লেখ না করলেই নয়। ওঁর ব্যবহার ও আতিথেয়তা এবং ওই স্কুলের সকল স্টাফেদের সহযোগিতা আমাদের কে অনুপ্রাণিত করেছিল অঙ্গীকার করতে, যে আগামী দুমাসের মধ্যে আবার একটা শিবির - বিশেষ করে শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য করার। কিন্তু শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী, কলকাতা শিশুদের  জন্য বিশেষ ধারাবাহিক ক্যাম্পের প্রোজেক্ট থাকায় সেটা আর আমাদের গ্রুপের থেকে করা সম্ভব হয়নিতবে আমি নিজে বড় দিদিমনির সাথে কথা বলে ওখানেই বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক ক্যাম্প করেছিলাম।

      এটা হয়তো বলা খানিকটা প্রাসঙ্গিক হবে যে আমার এই সেবামুলক কাজের উদ্যোগ দেখে শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী বাহিনী,  কলকাতা শাখা তাদের বাৎসরিক আনুষ্ঠানে আমাকে বিশেষ সম্বর্ধনা দিয়ে সন্মানিত করেছিল যা আমাকে পরবর্তী কালে এই ধরনের আরো অনেক সেবামুলক কাজে ভীষণ উৎসাহ যুগিয়ে ছিল ।

** জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর**

জয় শ্রী রামকৃষ্ণ, জয় শ্রী সারদা মা, জয় শ্রী বিবেকানন্দ

-  সমাপ্ত -