ছেলেবেলা

গোপা ভট্টাচার্য্য

আমার ঠাকুরদা - আমরা দাদু বলেই ডাকতাম। আমার জীবনের প্রথম আঠারোটি বছর তাকে ঘিরেই আবর্তিত। আমার শৈশবের খেলার সাথী, আমার শৈশবের বন্ধু, এক কথায় আমার পথ প্রদর্শক। জীবনের ভালো মন্দ ঠিক বেঠিক সব তাঁরই শিক্ষা। দাদু ছিলেন আমার কাছে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ, ইংরেজীতে সেক্সপিয়ার ও সংস্কৃতে কালিদাস। এ হেন সর্বজ্ঞানী দাদুকে ছোটবেলায় প্রশ্ন করেছিলাম পয়সা কোথায় পাওয়া যায় ? দাদু উত্তর দিলেন, "এ তো জলের মতন সহজ উত্তর"। পয়সার গাছ আছে, পয়সা তো গাছে ফলে। আমার ছোটবেলায় ঝালমুড়ি, কচুভাজা, তেঁতুলের আচার, ফুচকা খাওয়ার খুব লোভ ছিল। কিন্তু এগুলো কিনতে তো পয়সা লাগে। আমাদের বাড়িতে ছোটদের হাতে পয়সা দেওয়া হতো না। আমি দাদুকে পয়সার গাছ এনে দিতে বললাম। দাদু বললেন, "এ গাছ দুস্প্রাপ্য" - সহজে বাজারে পাওয়া যায় না"। আমার পীড়াপীড়ি’তে দাদু আনতে বাধ্য হলেন। কিন্তু একটা শর্ত দিলেন। গাছকে জল ও যত্ন দুটোই করতে হবে তবেই এই গাছ বাঁচবে। পয়সার গাছের জন্য আমি তো যে কোনো শর্তে রাজি। এর পর শুরু হলো অনন্ত প্রতীক্ষা। পড়ায় মন নেই, রাতে ঘুম নেই - পয়সার গাছের স্বপ্নে আমি বিভোর। অবশেষে এল সেই সু-দিন যেদিন দাদু একটি ছোট্টো গাছের চারা আমার হাতে দিয়ে বললেন, "এই নাও তোমার পয়সার গাছ"। আমি চমৎকৃত, উৎফুল্ল ও আত্মহারা। এর পরে শুরু হলো গাছের যত্ন নেওয়া। রোজ স্কুলে যাওয়ার আগে এক কাপ জল ঢালতাম আর পরের দিন লক্ষ্য করতাম একটুও বড় হলো কি না। এই ভাবে একমাস অতিক্রান্ত, কিন্তু পয়সার গাছের কোন বাড়বৃদ্ধি নেই।

        আমি উদ্বিগ্ন হয়ে দাদুকে জিজ্ঞাসা করলাম, গাছ কেন বাড়ছে না ? দাদু উত্তর দিলেন, "যত্নের অভাব", আমি জলের পরিমাণ বাড়িয়ে ওটা একগ্লাস করে দিলাম। যথারীতি আমার অতিরিক্ত ভালোবাসা ও যত্নে পয়সার গাছের অকাল মৃত্যু হলো। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কি হলো ? দাদু মিটিমিটি হাসছিলেন, সেদিন আমি ক্ষোভে দু:খে হতাশায় দাদুর পিঠে আক্ষেপ-সূচক কিল মেরে কেঁদে ফেলেছিলাম। এই ঘটনার রেশ আমার মনে সুগভীর রেখাপাত করেছিল যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। জীবন-পাঠে দাদুর ঐ নির্মল ভালোবাসা-জারিত শিক্ষা জীবনের মুল্যবোধকে আরো গভীর করেছে তাই এই ছোট্টো স্মৃতি চারণার মধ্য দিয়ে আমার দাদুকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

সমাপ্ত