ধন্যি মেয়ে—

গৌতম দত্ত

     ১৯৭১। জয়শ্রী’তে দেখতে গেছিলাম ‘ধন্যি মেয়ে’।  যতদূর মনে পড়ে নিঃসন্দেহে দিনটা ছিল শনিবার। জাষ্ট আগের দিনই রিলিজ করেছে গুরু’র এই বই-টা। ‘বই’ শুনে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা একটু হেঁচকি তুলতেই পারে। এখন এরা বলে ‘মুভি’। আমরা তখন সিনেমাকে ‘বই’ বলতেই অভ্যস্ত ছিলাম। জয়শ্রী’তে সাধারণত শো-টাইম ছিল ২টো, ৫টা আর ৮টা। ম্যাটিনি, ইভিনিং আর নাইট। যাই হোক, গুরু মানে উত্তমকুমারের নতুন বই দেখার জন্য উৎসাহ ছিল তুঙ্গে।

তখন আমাদের বরানগরের বুকে পুরোপুরি নকশাল আন্দোলন চালু। আগের বছর নাইন থেকে এমনি এমনিই ক্লাসে উঠে গেছি পরীক্ষা ছাড়াই। এর মধ্যেই আমাদের প্রাইমারি সেকশনের মাষ্টারমশাই নন্দ’দা একদিন খুন হয়ে গেলেন নকশালদের হাতে। রোজই বোমা, গুলি, ধরপাকড়, পুলিশের রেড এসব দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম। এই সব কিছুর মধ্যেই চলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। তখন আমার ক্লাস টেন। আর তাই স্কুলের নিয়মকানুন একটু শিথিল ছিল আমাদের জন্যে। যেমন টিফিন পিরিয়ডে আমরা স্কুলের গেটের বাইরে আসার ছাড়পত্র পেয়েছিলাম এই ক্লাসে উঠে। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠান হলেই আমাদের ডাক পড়াটা ছিল অবশ্যম্ভাবী। সোজা কথায় পাখনা গজানোর শুরু সেটা।

  জয়শ্রী সিনেমা হলটা এক্কেবারে আমাদের স্কুলের উলটো পারেই। সুতরাং কবে কখন কি সিনেমা চলছে তা দু-বেলাই স্কুল যাতায়াতের পথে চোখে পড়তোই। আর  তাই আগেই টিকিট কেটে রাখা ছিল। ধন্যি মেয়ের পোষ্টার পড়ে গেছে দেওয়ালে দেওয়ালে। কি দারুণ কাস্টিং !

  সাহিত্যিক ‘বনফুল’-এর ভাই শ্রী অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের একটা মিষ্টি ছবি এই 'ধন্যি মেয়ে'। জমিদার গোবর্ধন চৌধুরী’র ভূমিকায় জহর রায়। মূল নায়ক নায়িকা পার্থ চ্যাটার্জি (বগলা) আর জয়া ভাদুড়ি (মনসা) হলে কি হবে, আসল তো উত্তম-সাবিত্রী জুটি। বগলা’র দাদা বৌদি। ফুটবল নিয়ে একটা জমজমাটি বাংলা হাসির ছবি। কলকাতার কাছাকাছি জগৎবল্লভপুরে তোলা হয়েছিল এই সিনেমার প্রায় অধিকাংশ বহির্দৃশ্য। হারিয়ে যাওয়া হাওড়ার “মার্টিন রেল”-কে এখনো জ্যান্ত দেখা যায় এই সিনেমাটা দেখলে প'রে।

  আর অভিনয়ের কথা ! সেতো মার-কাটারি ! এখনো যদি টিভিতে 'ধন্যি মেয়ে' চলে আর সেটা হঠাৎ আমার চোখে পড়ে যায় তাহলে রিমোট হাত থেকে ফেলে দিতে হবে, এমনই আকর্ষণ এই সিনেমাটার। বগলার দাদার চরিত্রে একটা ষ্টিরিও টাইপ অভিনয় করে গেলেন গুরু আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে সাবিত্রী। অবশ্য কেউই কম যান না এ ছবিতে। গ্রামের পুরোহিত ভট্‌চায্‌ এর সেই টিকি-মাথা চরিত্র যখন ফুটবল ম্যাচের রেফারি হয়ে যান জমিদার গোবর্ধন চৌধুরী’র আদেশে, তখন তার ব্যথা-বেদনা-আনন্দ এসব কিছু মিলিয়েই রবি ঘোষ এক অসাধারন চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিলেন এই সিনেমায়। বাংলা সিনেমায় জয়া ভাদুড়ি'কে আমি প্রথম দেখি এই ছবিতে-ই ‘মনসা’ চরিত্রে। বাপ-মা হারা গ্রামের এই প্রাণচঞ্চল মেয়েটি জমিদার মামার কাছে মানুষ হলে কি হবে, মেজাজ মর্জিতে যেন এক্কেবারে ঝাঁসির রানী ! তখন কি সব অভিনেতা অভিনেত্রী ছিলেন আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রে ! আমরা খুব ভাগ্যবান যে বাংলা সিনেমার সুবর্ণযুগের সব শিল্পী'র অভিনয় আমরা প্রাণ ভরে দেখতে পেয়েছি। এই ছবিতে একটা ছোট্ট চরিত্র মনি শ্রীমানি’র ‘কামাখ্যা’। একটা কানে খাটো মানুষ যিনি কিনা মাইক ইত্যাদির দোকান চালান, তাঁর কি অসামান্য অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল, ঐটুকু ছোট্ট সময়ের অভিনয়ে !

তা এমন একটা দুর্দান্ত সিনেমা শেষ হয়েছে সবে। মাথার মধ্যে নেশা ধরানো ঝিমঝিম। জাতীয় সঙ্গীতের পরেই সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে আসার পালা। মনের আনাচে কানাচে ‘মনসা’-র মত একটা নায়িকার অনুরনণ। ‘এ ব্যথা কি যে ব্যাথা’ যেন আমারই মনেরই ব্যথা হয়ে গুনগুন করেই যাচ্ছিল সারাটা ক্ষণ। জয়শ্রী হলে'র কাঠের দরজা দিয়ে বেরিয়েই সব ছন্দ, সব অনুরণন উধাও হয়ে গেল। সিনেমা হলের মূল কোলাপসিবল গেট বন্ধ। হাউসফুল দর্শকের ভীড়ে ওইটুকু জায়গায় নিঃশ্বাস ফেলা দায়।

ওই কোলাপসিবল গেট অল্প ফাঁক করে একজন একজন করে বার করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অজস্র পুলিশের কয়েকজন। সামনেই দাঁড়িয়ে পুলিশ ভ্যান। মেয়েদের বাচ্চাদের বয়স্কদের ছাড় দিয়ে আমাদের থেকে আরও বড় যাঁরা, তাঁদেরকেই কি যেন জিজ্ঞেস করে করে যাঁকেই ভাল লাগছে ওই পুলিশগুলোর, তাকেই ভ্যানে তোলা হচ্ছে। আতঙ্কে আমি তখন দিশেহারা ! লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরব শনিবারের বারবেলায়, এই ইচ্ছের একেবারে ডাঁটাচচ্চড়ি !  বাড়িতে জানে এক্স্ট্রা বাংলা ক্লাস করে বাড়ি ফিরবে ছেলে !

ওই বয়সে আমরা যে কতখানি আতা ছিলাম এখন তা বুঝতে পারি। আমার ঠিক আগের এক দাদা’কে পুলিশ জিজ্ঞেস করল ‘কোথায় বাড়ি ?’। সেই দাদা বলল 'নৈনান পাড়া'। ও হরি ! তাঁকে ছেড়ে দিল। এর পর আমার পালা। কোথায় থাকিস ?  জোরালো আওয়াজে তো আমার ফুল প্যান্টুল ভিজে যায় আর কি ! বললাম 'টবিন রোড'।

ওমা ! 'টবিন রোড' শুনেই আদেশ হল ভ্যানে ওঠার। নারকেল গাছে না পড়ে বাজ পড়ল যেন ঢ্যাঙা আমারই মাথায়। ভ্যানে ওঠার মধ্যেই দু-এক লাঠির ঘা পড়ে গেছে পেছনে।

প্রায় জনা ত্রিশেক বাছা বাছা ক্রিমিনাল নিয়ে পুলিশ ভ্যান রওনা দিল বরানগর থানার দিকে। তখন বরানগর থানা ছিল গঙ্গার ধারে কুঠিঘাটে। ওখানে নিয়ে গিয়ে ভ্যান থেকে নামিয়ে সামনের বটগাছটার চারধারে আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে কয়েকটি পুলিশ থাকলো পাহারায়। মোটামুটি আদ্ধেক ক্রিমিনালই আমার বয়সী। এর পরে যে কি হবে সে কথা আজও ভাবলে - ঘাম আসে শরীলে.........।

খবর চাপা থাকে না। এই থানার আশপাশেই কার যে চোখ পড়েছিল আমার ওপর, তা আজ অব্দি আমি জানি না, কিন্তু এটুকু জানি যে আমার এই ক্রিমিনাল হয়ে ধরা পড়ার খবর, প্রথমে স্কুলে এবং সেখান থেকে বাড়িতে পৌঁছে গেছিল ঘন্টা খানেকের মধ্যেই। স্কুলে ভাল ছেলে হিসেবে মোটামুটি একটা পরিচয় ছিলই। সেই সময়ে আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন রমানন্দ মহারাজ। ও বলাই তো হয়নি, আমি ছিলাম বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের ছাত্র। আর কি জানি কি কারনে মহারাজের খুব প্রিয়পাত্র। সেই আমি—এক মুহূর্তেই, কি করে যে ক্রিমিনাল হয়ে পুলিশের কালো প্রিজন ভ্যানে চেপে থানায় চালান হয়ে গেলাম সে আর জানার উপায়ও নেই। ঠিক যেমন জানার আর বোধহয় কোনো উপায়ও নেই, বরানগর-কাশীপুরের সেই গণহত্যার নির্মম ইতিহাস !! কোথায়, আর কি করে এবং কাদের দ্বারা ঘটেছিল সেই সব রক্তাক্ত কটা দিনের ঘটনা, সে ইতিহাসের সমস্ত দলিল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল কী করে, তাও নাকি জানা যায় না। পরবর্তী কালে বড় হয়ে জানতে পেরেছি যে সেই ইতিহাস এখনো অব্দি কারোর দ্বারাই উদ্ঘাটিত হয় নি। নকশাল আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর হতে আর বোধহয় খুব দেরী নেই বোধহয় ! ইদানীংকার বই মেলায় দুএকজন পুরোনো নকশাল আন্দোলনে শামিল হওয়া মানুষের সাথে পরিচয় হলে যখন জিজ্ঞেস করি এই কথা তখন উত্তর শুনি যে সরকারি সমস্ত কাগজপত্তর হাওয়া হয়ে গেছিল কোনো দল বা ব্যক্তিবিশেষের অভিলাষে তখন চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। শুধু একটা স্মারক হিসেবে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু একটা শহীদ বেদী উদ্বোধন করেছিলেন যেটা এখন সিঁথির মোড়ের অটোর লাইনের পেছনদিকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় মাত্র।

যাই হোক, সন্ধ্যে নামল গঙ্গার পাড়ে। উলটো দিকেই বেলুড় মঠের প্রার্থনার আওয়াজ তখনও হয়ত ভেসে আসত কুঠিঘাটের দিকে। কিন্তু সেসব আর কিছু মনেই নেই। শুধু মনে আছে আস্তে আস্তে রাস্তার ডুম্‌-গুলো জ্বলে উঠতে লাগল। থানার ভেতরেও সেই লাল লাল ডুম্‌ একটা গোল শেডের মধ্যে গঙ্গার হাওয়ায় হাওয়ায় অল্প অল্প দুলতে থাকল। তখনো অব্দি সরকারি দপ্তরে ওই ষাট বা একশো ওয়াটের ডুমের আলোই জ্বলতো। সাদা টিউবলাইট এসেছে তারও অনেক পরে।

শুরু হল এক এক করে ডাক। সেই প্রথম জানলাম থানার ওসি'কে বড়বাবু বলেই ডাকে সবাই - অন্ততঃ আড়ালে। আর তাঁর অধস্তন পুলিশের কাছে তিনি শুধুই ‘স্যার’। ব্রিটিশ শাসনকর্তাদের আর একটি মগজধোলাই করা এই সম্বোধন'টি স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও এখনো বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। বাঙালীর সম্বোধনেও আজ বেশ গেঁড়ে বসেছে এই ‘স্যার’ শব্দটা আমাদের সেই পুরোনো ‘মহাশয়—মশাই—মশায়—মহাই’ এর পরিবর্তে। কত আধুনিক হয়ে যাচ্ছি আমরা আমাদের বাঙালির সুপ্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে !

সন্ধ্যে সাড়ে-সাত কি আট-টা নাগাদ আমায় যেতে হল সেই বড়বাবুর টেবিলের সামনে। সেই টেবিলের দুপাশে আরো দুই পুলিশ। আমি সামনে যেতেই পর পর প্রশ্ন ধেয়ে এল নিয়মমাফিক। কি নাম, কোথায় থাকা হয়, কি করা হয়, কেন সিনেমা দেখতে গেছিলাম, নকশাল পার্টি করি কিনা ইত্যাদি অসংখ্য অসংখ্য জিজ্ঞাস্য। আর দেখলাম আমার বলা উত্তরগুলো সবই একজন লিখছিলেন একটা কাগজে। এর মধ্যেই দেখা গেল আমার বড় কাকা এসে আমার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তো তখন ফাঁসির সময় গুনছি। মাথা নীচু !!

এই সব মূল্যবান জবাব লেখার পরে আমাকে মুক্তি দেওয়া হল অনেক হম্বিতম্বি করার পর। ক্রিমিনাল জগৎ থেকে আবার ফিরলাম আমার জগৎ-এ। কাকা গম্ভীর। একটা রিক্সা ডেকে কাকা আর আমি রওনা দিলাম বাড়ির দিকে। মনের মধ্যে অসংখ্য জোনাকির জ্বলা নেভা। কি কি প্রশ্ন আমার দিকে আসবে আর তার কি কি বানানো উত্তর দেব সেই ভাবনায়। বাড়ি এবং স্কুল - দুজায়গাতেই। মিথ্যে কথা বলে সিনেমা দেখা ! ১৯৭১ সালে !  তখনও রাস্তার আলো জ্বলে গেলে বাড়ি ঢুকতেই হত আমাদের বয়সী সব ছেলেদেরই। অলিখিত এই সিষ্টেমকে আমরা কেউ কখনোই প্রশ্ন করতে শিখিনি বা পারিনি।

আমার আদরের দিদিভাই মানে আমার ঠাক্‌মা তখনো বহাল বেঁচে। এতটা রাস্তা রিক্সায় কাকা সেই ফেলুদার মত যতখানি গম্ভীর ততখানি সিরিয়াস। আমিও তথৈবচ। ওদিকে ক্ষিধেয় পেটে ছুঁচোর কেত্তন - কিন্তু ক্ষিধে পাচ্ছে না ভয়ে। বাড়ি ঢুকতেই ফুলঝুরির ফুলের মত আবারও হাজারো প্রশ্নমালা ! খুঁজছি দিদিভাইকে। হঠাৎ ওই গর্জনের মধ্যেই যেন ভেসে এল পাহাড়ের ওপর থেকে বুদ্ধ মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি ! মিষ্টি। সুরেলা। বিশ্বাসের।

‘ভাই, কি হয়েছিল ? এসো আমার কাছে। খুব ক্ষিধে পেয়েছে তোমার, তাই না ?’

দিদিভাই আমাকে চিরটাকাল 'ভাই' বলেই ডাকতেন। আজকের দিনে ভাইফোঁটাও দিতেন আমায়।

 – সমাপ্ত –