আতঙ্ক -

কানাই লাল দাস


সাল ১৯৮৭। ফেব্রুয়ারি মাস।  তারিখ মনে নেই। সেবার কলকাতা থেকে আমি, আমার বসের সাথে কাজের খাতিরে আসাম গিয়েছিলাম। আমরা ডিব্রুগড় পৌঁছে এক ঘন্টা গাড়ি করে গিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছলাম। সারাটা দিন অফিসের কাজকর্ম সেরে আমরা দুজন ওখানকার  গেস্ট হাউসে পৌঁছলাম। সেও বেশ দূর। প্রায় পাঁচ কিমি জঙ্গলের ভেতরে। গেস্ট হাউসটি খুবই সুন্দর, কিন্তু খাঁ খাঁ করছে- আশেপাশে কোন লোকালয়ই নেই। বাইরে জঙ্গল।

সন্ধ্যে তখন ছ'টা - একটু চা পান করে শুয়ে পড়েছিলাম ক্লান্তিতে।  তখন প্রায়  রাত আটটা। হঠাৎ  ঘরের দরজায় ঠক্ ঠক্। আমি ভাবলাম হয়তো আমাদের কেয়ারটেকার। গড়িমসি করছিলাম দরজা খুলতে। কিছুক্ষণ পরে আবার ঠকঠক। নির্জন নিস্তব্ধ ওই গেস্ট হাউসে ওই আওয়াজ এমনিতেই কেমন ভয় ধরায়। ঘরের দরজার কাছে এসে খুঁজতে লাগলাম আই-হোল, যাতে দেখতে পারি কে এল। কিন্তু গেস্ট হাউসের ঘরের দরজায় কে ওসব লাগাবে আর !  নিরুপায় হয়ে দরজা খুলতেই হল।

দরজা খুললাম। কোন কিছু না বলে তিন জন লোক অতর্কিতে আমাদের ঘরে ঢুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।শান্তভাবে চেয়ারে বসে বলল - আমরা ULFA এবং আমরা Donation নিতে এসেছি। ওরা দাবী করল ২০০০০/- (কুড়ি হাজার) টাকা।

আমার বস তো ভয়ে কাঁপছে। কারন তিনজনের কাছেই রিভলবার দেখা যাচ্ছে। ওরা বলল আগামীকাল সকালে ওরা আবার আসবে। কোনো রকমে আমি জিজ্ঞেস করলাম - এটা কিসের জন্য।  বলল - কোন কারন নেই।  যদি "না" বলেন তাহলে আমরা বুঝে নেব। পরে বলতে পারবেন না যে সাবধান করিনি। রিস্ক আপনাদের। তারপর যেমন এসেছিল তেমনভাবেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

এবার, কেয়ারটেকারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম। বলল - আমি কিছু জানিনা, আমি কিছু বলতে পারব না। বসের সাথে কথা বললাম। তিনি আমাকেই দায়িত্ব দিলেন ব্যাপারটা মিটমাট করতে। আমি আর কি করি !  বাধ্য হলাম একটা রফা করতে। যতই হোক কলকাতায় পুজোর চাঁদা আদায়কারীদের যেমন বলি আর কি !! ওই অভিজ্ঞতা দিয়েই ওদের সাথে দরাদরি করে অবশেষে ৫০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকায় রফা হল। ওরা যাওয়ার সময় বলল আমরা যেন কাউকেই কিছু না জানাই।

পরের দিন সময় মত এসে টাকা নিয়ে গেল। যদিও আমরা ৪৯০০/- টাকাই জোগাড় করতে পেরেছিলাম। আমাদের কাছে আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট ছিল না ওই জঙ্গলের মধ্যে।  টাকাটা গুনে নিয়ে বলল - আপনাদের আর কোন ভয় নেই - কেউ কিছু বলবেনা। আমরা সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। ভয় করছিল প্রচন্ড। এই একার tension কিসের জন্য এবং কেউ কোন প্রতিবাদ করতে পারবেনা।

সত্যিই কি আমরা স্বাধীন হরেছি ? এই আতঙ্ক কেন হবে ?   দিনের আলোয় এরা রিভলভার, বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াছে। এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা।

সমাপ্ত