স্মৃতিটুকু -
বিপদ ভঞ্জন রুদ্র

আমাদের স্কুল ব্যাচের (১৯৭৩ পাশ আউট) একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে, একটি পত্রিকা বার করা হবে। শুনেছি সেই পত্রিকা হবে ওয়েব আকারে যাতে যে কেউ ব্রাউজারে গিয়ে খুলে দেখতে পারে। আমাদের স্কুলের দেওয়াল পত্রিকার নাম ছিল "চরৈবেতি"। সেটাকে স্মরণে রেখেই সবাই মিলে ঠিক করা হলো যে আমাদের এই নতুন পত্রিকারও নাম হবে 'আবার চরৈবেতি'।
আমি কোনোদিনই কোনো গ্রুপে লিখিনি কিছু। বলা হল যে ম্যাগাজিনের জন্য লিখতে নাকি হবে তবুও। অগত্যা নাছোড়বান্দা সুনীল আর অমলেশের চাপাচাপিতে কিছু লিখতেই হচ্ছে ।

পুরোনো সে সব দিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয় যে তখন ছিল এক সুন্দর আনন্দময় পরিবেশ। তবে হঠাৎ করেই ২০১৯ সালে ঘটে গেল আমার স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের সাথে মুলাকাতের একটা বিরাট সুযোগ। উদ্যোগটা ছিল অভিজিতের। উপলক্ষ ছিল রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের সারা ভারতের প্রাক্তন ছাত্রদের একটা পুনর্মিলন। আর এর স্থানটা ছিল বিশ্ববিখ্যাত বেলুড় মঠ প্রাঙ্গণ। সারা ভারত থেকে আসা রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্রদের ভীড়ে গমগম করছিল উৎসব প্রাঙ্গণ। উফ্ সে কি এলাহী ব্যাপার যা না দেখলে বিশ্বাসই করা কঠিন। নিশ্ছিদ্র নিঃশব্দ নিপুণ ব্যাবস্থাপনা। উৎসবটা চলেছিল দু দিন ধরে ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯।

আমরা ছিলাম ১৯৭৩ ব্যাচের ৮/১০ জন। আর বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম থেকে প্রায় ৮০/৯০ জন। সকাল থেকে বিকেল, একের পর এক একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাঝে ছিল ভোজন পর্ব। বেলুড় মঠের নতুন তৈরি ভোজনালয়ে সে কি এলাহি ব্যাবস্থা ! এখানেও সেই মঠের ডিসিপ্লিন দেখার মত, শেখার মত। বেলুড় মঠের সাধু সন্ন্যাসীদের ব্যাবস্থাপনা, খাব কি, শুধু দেখছি আর দেখছি। সুনীল গৌতম'রা শুধু ছবিই তুলে যাচ্ছে। সত্যিই, না এলে কতো কি অদেখা অজানা থেকে যেত।


বৈকালীন চা/কফি বিস্কুটের প্যাভেলিয়ন'টা ছিল গঙ্গার ধারে। সবাই আছি, গল্প গুজবের ফাঁকে সবার পরিচিতি পর্ব বেশ চলছিল, কে কোথায় চাকরি বা ব্যবসা করেছে, ছেলেপুলে কটি ইত্যাদি সব আর কি ! এরই ফাঁকে হঠাৎ দেখা গেল, দীপক নেই। হাল্কা হাসি সবার মুখে খেলে গেল। দীপক'কে নিয়ে এমন কয়েকবার হয়েছে। গ্রুপের এই হাল্কা মেজাজের ফাঁকে আমি একটা চেয়ার নিয়ে গঙ্গার ধারে এসে বসলাম। গঙ্গায় তখন ভাটার স্রোত, জলের আলোড়ন কম। নানান ভাবনায় দৃষ্টি স্থির হয়ে এল, স্রোত তো বয়েই চলেছে। গোমুখ থেকে না জানি এই জল কতদিন ধরে প্রায় ২৫০০ কি.মি. পাড়ি দিয়ে বেলুড় মঠের তীর ছুঁয়ে বয়ে চলেছে সাগরের পানে। আমাদের জীবন স্রোত তেমনই, স্কুলের পরে কলেজ। তারপর কর্মস্থল খুঁজে পাওয়া, এরপর সংসার করা, ছেলেপুলেদের মানুষ করা এবং তাদেরকে জীবন যুদ্ধে লড়তে সাহায্য করা তার পর এক দিন কর্মস্থল থেকে অবসর নেয়া।
এর কোন স্তরেই আমার কোন বিশেষ সুখস্মৃতি নেই। হ্যাঁ, এটা ঠিক আমি অন্যান্য বন্ধুদের মত সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি। তবে আমার কর্মজীবন যে সপ্তসুরের ধারায় বইয়ে দিতে পেরেছি তার মধ্যে দিয়ে অপার জীবনানন্দ পাই। অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে। তাল ও সুর হাত ধরাধরি করে যে মেলোডি তৈরি করে তা স্বর্গীয় অনুভূতিতে তৃপ্ত করে। কখনো শেখাতে গিয়ে ,কখনো সঙ্গত করতে গিয়ে মাঝে মাঝে তার ছোঁয়া পাই। তৃপ্ত হই। আজ মনে পড়েনা প্রথম কবে কাকে আমি তবলা শেখাতে শুরু করি, মনে পড়েনা কার সাথে সঙ্গত করতে গিয়ে প্রথম সুরসাগরে ভেসেছি।
সুরে গান গাওয়ার পাশাপাশি তালের নিয়ম মেনে চলাটাও জরুরি। তাল হচ্ছে সঙ্গীতের এক ছন্দোবদ্ধ কাঠামো যা নির্দেশ করে, কখন সুরে বাজবে, কতক্ষন ধরে বাজবে এবং কি পরিমানে বাজবে। সুর এবং তাল সংগীতকে পরিপূর্ণতা দেয়। এরা একে অপরের পরিপূরক। আমাদের জীবন যুদ্ধেও তেমনি ছন্দ ও লয় আছে, সেও কেটে গেলে বেসুরে বাজে।
৯০ দশকের আগে বাংলা গানে গায়ক গীতিকার ও সুরকার যতটা প্রচার বা স্বীকৃতি পেত সঙ্গতকার বা সঙ্গতকারিরা তা পেতো না। সুতরাং সঙ্গতকারেরা সঠিক স্বীকৃতি পেতো না। এর পর কম্পিউটার ও সফ্টওয়্যারে'র প্রভাব এলো সঙ্গীত জগতে। ভালো মন্দ বিচার সরিয়ে রেখে, গুণগত মানে তুলনায় না গিয়ে বলা যায়, এমন অনেক শিল্পী উঠে এল যাঁরা নিজেই গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। এমন কি সকল যন্ত্রানুষঙ্গ যেমন ড্রাম তবলা সবকিছু-ই মাল্টি ট্রাকেতে রেকর্ড করে নিয়ে শেষে ভোকাল ট্রাকে গান।
ইদানিং কালে কত রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। প্রকৃতিজাত শব্দ দিয়ে কম্পোজ হচ্ছে গান। প্রথাগত গানে কথা, সুর, তাল, লয়, মাত্রা ইত্যাদির একটা গুরুত্ব ও মর্যাদা আছে। কিন্তু সফ্টওয়্যার, ডিজিটাল অডিও ওয়ার্ক ষ্টেশন (DAWS) এইসবে'র দ্বারা যে কোন গানের পূর্ব পরিকল্পিত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ট্র্যাক একের অধিক হতে পারে। যেমন একটা ট্রাকে সেতার, একটাতে গিটার, একটাতে তবলা, তেমনি একটাতে গান ইত্যাদি DAWS তে ফেলে দিয়ে তৈরি হয়ে যাচ্ছে একটা গান।
কিশোর কুমারের একটা গান মনে পড়ে, "অনেক জমানো ব্যাথা বেদনা, কি করে গান হোলো জানি না।"
এর সাথে বর্তমানে চলছে এই DAWS তে হয়ে ওঠা গান !!! এই গান সঙ্গীত জগতের মাধুরী’কে যান্ত্রিক করে তোলে। এর উপরে এসে জুটেছে নবীনতম উৎপাত AI. আমি তো শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম যে কি করে একটা বিড়ালের ডাক কি ভাবে গান হয়ে উঠলো। বিশ্বাস হচ্ছে না তো ! আমিও তো প্রথমে কল্পনাতেও মেলাতে পারিনি। আমরা আপন মনের মাধুরী ঢেলে যে সুর-তাল লোকে বিচরণ করি, প্রযুক্তির দাপটে তার স্রোত কি এমনি করে বেগহীন যান্ত্রিক আবেগে পরিনত হবে !
বিড়ালের ডাক থেকে হয়ে ওঠা গানের লিঙ্ক টা নিচে দিলাম । সবাইকে অনুরোধ করবো একবার শুনতে তার পর? তার পর সবার মতামত শুনবো।
## বেলুড় মঠের দুদিনের সেই মধুর স্মৃতির কয়েকটি ছবি দিলাম এই লেখাটার সাথে।
== ## ==