কিছু স্মৃতি - 

সঙ্গীতা চক্রবর্তী

        বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনীদের (১৯৭৩ ব্যাচ) সমবেত প্রচেষ্টায় একটা ই-ম্যাগজিন বার করতে চলেছে। সেখানে আমি প্রত্যক্ষভাবে সদস্য না হলেও, আমার স্বামী দীপঙ্কর চক্রবর্তী (সকলের দীপু) সদস্য।  স্বামীর বন্ধুদের অনুরোধে আমার এই ছোট্ট লেখাটা দেওয়ার সাহস করলাম। যদিও প্রাত্যহিক জীবনে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকার দরুন এবং সুলেখিকা না হবার সুবাদে মনে যা এলো তাকেই এলোমেলোভাবে তুলে ধরার সাহস করলাম। 

        আমি দীর্ঘ ৩৮ বছর কলকাতা টেলিফোনস-এ কর্মরতা ছিলাম।

আমার চাকুরী জীবন মূলতঃ টেলিফোন ভবন কেন্দ্রিক - যেখানে আমরা প্রায় ১৫০০-২০০০ মহিলা ছিলাম। কাজেই নিজের সংসারের বাইরে অফিস ছিল আমাদের দ্বিতীয় সংসার, যেখানে আমরা আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সমস্যা ইত্যাদি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতাম এবং ওখান থেকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেরেছিলাম যে আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজের সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে বড় মনে করতাম, কিন্তু আসলে তা নয়, আমার চেয়েও অনেক বেশী সমস্যা অন্য অনেকের জীবনে আছে, তারা যদি সেটার মোকাবিলা করতে পারে, তবে আমিও পারবো - এই 'হার না মানা' মনোভাব। 

 
        আমাদের চাকুরী জীবনে নানা মজার কান্ড-ও ছিল। আমরা যেহেতু ট্রাঙ্ক- এক্সচেঞ্জে ছিলাম, দূর-দূরান্তের (সারা ভারতের) সাথে আমাদের কাজ করতে হতো। এখনকার মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা (Technology) তখন এতো উন্নত ছিল না, মূলত ভারতের বড় বড় কিছু শহর বাদ দিয়ে সব জায়গার কল চলত অপারেটার’দের মাধ্যমে। এই ভাবে কাজ করতে গিয়ে সারা ভারতের অপারেটর’দের সঙ্গেই আমাদের কথাবার্তা হোত। আমাদের বেশ কিছু বন্ধু, সিনিয়র দিদি এইভাবে কাজ করতে করতে গভীর প্রেমে জড়িয়ে পরিণয়সূত্রে পর্যন্ত আবদ্ধ হয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হোল, এই ক্ষেত্রে কেউই একজন অপরজনকে চোখে দেখেনি, সুধু গলার স্বর শুনেই প্রেমে পড়া এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে করা। আবার অনেক সময় এমন-ও হয়েছে দূর থেকে দেখে পছন্দ না হওয়ায়, ওখান থেকেই সম্পূর্ন শেষ করে বেরিয়ে আসা, কারণ একে অপরকে চিনতো না। আমি এই রঙের শাড়ী পরে আসবো, তুমি এই রঙের জামা পরে আসবে - এই রকম ব্যাপার ।

        এ ছাড়াও, আমরা সাহায্য পেয়েছি নানান ভাবে। একবার আমরা দীঘা বেড়াতে যাব ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে, ক্রিসমাসের ছুটিতে, হঠাৎ ঠিক হওয়ায় কোন হোটেলের খোঁজ পাচ্ছি না, কাঁথির অপারেটারের সাথে চাক্ষুষ পরিচয় না থাকলেও হোটেল বুক করে দিয়েছিলেন, ও আমরাও খুব ভালোভাবে বেড়িয়ে এসেছিলাম।

            আর একটা ঘটনা, আমাদের কাকা  মালদায় থাকতেন, উনি খুব অসুস্থ থাকা অবস্থায় আমাদের আর এক কাকা ও ভাসুর কলকাতা থেকে মালদা যান, সেখানে কিছুদিন থাকার পর ওনারা যখন মালদা থেকে ফেরার পথে ট্রেনে, তখন অসুস্থ কাকা মারা যান, সেইসময় ওদের ট্রেন যেখানে ছিল হাওড়া স্টেশন থেকে খবর নিয়ে সেই স্টেশনের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের অপারেটর’কে ধরে স্টেশনে Announcement করানো হয়, যে আপনারা কলকাতায় ফিরবেন না, আপনাদের আত্মীয় মারা গেছেন, আপনারা মালদা’য় ফিরে যান। সেই সময় এটা যে কতো বড় উপকার এখন হয়তো বুঝব না, এখন সকলের হাতেই মুঠোফোন, কিন্তু ঐ সময়কে বিচার করলে এটা ছিল বিরাট ব্যাপার।

প্রকৃতপক্ষে, টেলিফোন আমাদের প্রথম থেকে আজও পর্যন্ত এভাবেই বন্ধুর মতো সাহায্য করে চলেছে। আজ যেখানে আমাদের অধিকাংশেরই  ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে, তাদের কে একটু চোখের দেখা, গলার স্বর শোনা, সবই এর জন্য সম্ভব।

যাক, অনেক বকবক করলাম, পড়তে হয়ত বিরক্ত লাগতে পারে, কিন্তু এগুলো সবই নিছক জীবন থেকে নেয়া, সত্য বাস্তব ঘটনা।

এই ই-ম্যাগাজিনে আমার  সামান্য স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এটুকু ভাবতে ভাল লাগছে যে আমার স্বামীর সেই ছোট্টবেলার স্কুলের বন্ধুরাও জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আবার এসে একসঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে এবং সেই সঙ্গে আমাদের ঘরনীদেরকেও মিলিত হবার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ যখন আমাদের ছেলে মেয়েরা সব নিজ নিজ জগতে ব্যস্ত, তখন আমাদের এই একসঙ্গে থাকাটাও অক্সিজেনের মতো।    তাই কবি শঙ্খ ঘোষের কথায় "আয়, আমরা বেঁধে বেঁধে থাকি।"

 - স মা প্ত -