সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

শ্যামল চক্রবর্ত্তী

        সে আজ অনেকদিন আগের কথা, আমি তখন বি. এস. সি. সেকেন্ড ইয়ার। বোধহয় ১৯৭৫ সাল। একদিন ব্যাডমিন্টন খেলার শেষে রাতে সবাই মিলে আলোচনার সময় ঠিক হল আমরা সবাই মিলে যাব পৌষ মেলা দেখতে শান্তিনিকেতন। তখনকার যৌথ পরিবারের অবস্থা তো সবাই বুঝতেই পারছেন, বাবা ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারি কেরানি, আর আমরা ছয় ভাইবোন সবাই পড়াশুনা করছি। সংসারে সর্বদাই অভাব অনটন লেগেই ছিল। শুধু আমার বড়'দা সবে চাকরি পেয়েছে এবং সঙ্গে দাদার সবে বিয়েও হয়েছে। যাই হোক আমাদের দলে জনা দশেক বন্ধু। কিন্তু সবার অবস্থাই তো আমারই মত। অনেক হিসেব নিকেশ করে মাথাপিছু ৫০ টাকা খরচ ধার্য্য হল। মোট তিন দিনের ট্যুর। একটুও মিথ্যে বলছিনা। রোজ কলেজ যাওয়ার জন্য বাসভাড়া বাবদ ২ টাকা মা হাতে দিতেন এইভাবেই আমার চলতো। তখন আমার একমাত্র চিন্তা ৫০ টাকাই বা আমাকে কে দেবে। শেষ পর্যন্ত টাকা যোগাড় হল আমার বৌদি (আমারই বয়সী) আমাকে টাকা'টা দেওয়ায়। 

        ক্রমশ যাওয়ার দিন এগিয়ে এল। রাত্রে রোজই বন্ধুদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় মেতে উঠতাম কিভাবে যাবো কোথায় থাকবো মানে জীবনে প্রথমবার বন্ধুরা মিলে বেড়াতে যাওয়ার যে উত্তেজনা ওই আঠারো-উনিশ বছরে, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আর আমার কথা বলতে গেলে, একবারই পুরো পরিবার মিলে পুরীতে যাওয়া। সেবার মনে আছে, সঙ্গে বেডিং বিছানা সব কিছু নিয়ে কোনো ধর্মশালায় বোধ হয় ছিলাম। তখন আমি বেশ ছোট তাই সবই অস্পষ্ট স্মৃতি। যাই হোক সকাল দশটার পর একটা ট্রেনে চেপে সবাই তো বিকাল নাগাদ পৌঁছলাম বোলপুর, কল্পনা করুন ১৯৭৫ সালের শান্তিনিকেতনের কথা। আপনারা যেন এখনকার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। হোটেল ছিল বটে অল্প কিছু, কিন্তু তখনকার পৌষ মেলা যাঁরা জানেন না তাদের জানাই পুরো মেলা প্রাঙ্গন জুড়ে অজস্র স্টল, বিরাট বড় মেলা প্রাঙ্গন আর কি নেই তাতে - বাউল গান, সাঁওতালি নৃত্য আরো অনেক গ্রামীণ ক্রীড়ার আসর, অজস্র খাওয়ার স্টল, আমরা সবাই হাঁ করে সব দেখছি - এ যেন এক অদ্ভূত মিলনমেলা। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে হাজার হাজার মানুষ। 

        এদিকে সন্ধ্যে হতে চললো এখনো থাকার জায়গা ঠিক করা হয়নি। আমরা এবার একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। চারদিকে খোঁজখবর শুরু করলাম কিন্তু হায় কোথাও কোনো থাকার জায়গা নেই। সন্ধে সাতটা বেজে গেল। পৌষ মাসের ঠান্ডা, কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। অনেক উঠতি চ্যাংড়া ছোঁড়া জড় হয়েছে, ওরা সাধ্য অনুযায়ী থাকার জায়গা জোগাড় করে দিচ্ছেও অনেককে, কিন্তু আমাদের তো পকেটে মা ভাঁড়ে মা ভবানী। আমরা যে দাম দিতে প্রস্তুত তাতে ওরা বললো আপনাদের রাস্তাতেই থাকতে হবে না হয় স্টেশনে চলে যান মাথার ওপর ছাদটুকু তো পাবেন। 

        আমরা সবাই তাই স্থির করছি, ঠিক সেই সময় এক উঠতি চ্যাংড়া এগিয়ে এল। বললো 'হ্যাঁ আপনাদের জন্য একটা ব্যবস্থা হতে পারে কিন্তু দিন প্রতি পঞ্চাশ টাকা লাগবে। আমরা যেন হাতে স্বর্গ পেলাম ঠিক আছে ভাই চলো এক্ষুনি নিয়ে চলো..... কিন্তু ছেলেটি আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল ওটা কিন্তু একটা ক্লাবঘর। আমরা ভাবলাম হয়ত ক্লাবঘরে বেঞ্চি পাতা থাকবে - চলো ভাই এক্ষুনি নিয়ে চলো - ঠান্ডায় সবাই জমে যাচ্ছিলাম। প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটার পর একটু যেন গ্রাম্য একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। রাস্তার ধারেই দরমার বেড়া দেওয়া ক্লাবঘর। ছেলেটি বললো এই যে আপনাদের জায়গা। দেখি ঘরের কোনো পাকা দরজা নেই। সবচেয়ে বড় কথা মেঝেতে প্রচুর প্রচুর খড় পাতা। কোনো চৌকি বা বেঞ্চি কিচ্ছু নেই। মাথার ওপরে খড়ের চালা, সেটা দিয়ে চাঁদ-তারা সবই দেখা যাচ্ছে। তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে। আমাদের সবারই মুখ শুকিয়ে গেছে কিন্তু কোন বিকল্প ব্যবস্থা আর করা গেল না। সবাই মিলে ওই ঘরেই ঢুকে পড়লাম। শীতে অন্তরাত্মা কেঁপে যাচ্ছে, সবাই যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে খড়ের ওপর বসে পড়লাম। এখনও মনে আছে পাঁচ টাকায় মহামায়া হোটেলে পেটচুক্তি খাওয়ার কথা। আমাদের বুড়ো তো এমন পেটচুক্তি খেয়েছে যে সে আর হাঁটতেই পারে না। প্রায় চ্যাংদোলা করে তাকে নিয়ে আমরা ফিরলাম। রাতে ঠান্ডায় কেউই প্রায় ঘুমাতে পারলাম না। 

        সকালে ঘুম থেকে উঠে বাখারি'র দরজা খুলে বেরোলাম একে একে। হাত মুখ ধোওয়ার একটা কল ছিল কিন্তু কেউই খেয়াল করিনি যে কোনো বাথরুমই নেই।  এদিকে প্রকৃতির আহ্বান সবাই অনুভব করছি অল্পবিস্তর। শুরু হোল আবার অন্বেষণ কিন্তু নিতান্তই গ্রাম একটা। এপাশে ওপাশে কিছু বাড়িঘর আছে আর তা প্রায় সবই কাঁচা বাড়ি। সনৎ হঠাৎ চিৎকার করে আমাদের ডেকে বললো - এই দেখ্‌, পেয়ে গেছি।  গিয়ে দেখি একটা ঝোপঝাড় ঘেরা ছোট্ট পুকুর ; ব্যস পটাপট যে যার পজিসন নিয়ে বসে পড়েছি। তিন চার মিনিট পর পুকুরের ওপার থেকে তীব্র খনখনে গলায় এক বয়স্ক বুড়ি আমাদের দেখে চেল্লাতে লাগলো হারামজাদা, বজ্জাত, নচ্ছাড় আমার পুকুরে সব কটা মিলে হাগতে এসেছিস, দাঁড়া তোদের সব কটাকে তো ঝাঁটাপেটা করে দূর করছি, ও বাবা নরেন, সুবো আয়তো একবার পুকুর পাড়ে।

        সবে আমাদের বেগ এসেছিলো কিন্তু বুড়ির ঐ চিৎকারে সবাই তড়িঘড়ি উঠে দৌড় লাগালাম অন্য জায়গার খোঁজে।

        যাই হোক তারপর কিন্তু সারাদিন মেলায় ঘুরতে ঘুরতে দিব্যি কেটে গেল আর খাবার সময় বুড়োকে বারবার বললাম পেটচুক্তি খাওয়া মানে কিন্তু নিজেকে অসুস্থ করা নয়, যতটুকু পারিস ততটুকু খা, কিন্তু কে শোনে কার কথা আবার সেই একই অবস্থা। জিজ্ঞাসা করায় বললো রাতে তো আর আমার খাবার লাগবে না। আমার পাঁচ টাকা বেঁচে গেল।

        এইভাবেই ওই ক্লাবঘরেই দু-রাত্তির কাটিয়ে এবার আমাদের ফিরে আসার পালা। সবারই টাকা পয়সা মোটামুটি শেষ। আমাদের ট্রেন ছিল গভীর রাতে তবে তা আমরা সবাই রাত দশটার পর খাওয়া দাওয়া সেরে লাইন দিয়ে নির্জন রাস্তা ধরে চলেছি বোলপুর স্টেশনের দিকে, এখন হয়েছে কি একজায়গায় দেখি বেতের টুপি অনেক রয়েছে কিন্তু বিক্রেতা তো নেই কোনও। প্রথমে দেবু একটা টুপি মাথায় পরে নিয়ে এগোলো এবার ওকে দেখে আমরাও প্রায় সকলেই একটা করে টুপি পরে নিয়ে চললাম। রাস্তায় একটি ছেলে আমাদের জিজ্ঞেস করলো, দাদা কত করে নিলো টুপিগুলো ?  দেবু ফট করে বলে উঠলো ছ আনায় ছটা। স্টেশনের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি এমন সময় পেছন থেকে একটা আওয়াজ উঠলো 'চোর, চোর, ধর, ধর আমরা প্রথমটা ঠিক বুঝিনি একটু পরে দেখলাম বেশ কিছু লোক আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। তখন টুপি পরার কথাটা মনে পড়ায় আমরাও শুরু করলাম দৌড়। আমাদের পেছনে দলবল নিয়ে ধেয়ে আসছে টুপিওয়ালা। প্ল্যাটফর্মে ঢুকেও দেখলাম লোকগুলো আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে, তীব্র গোলমাল মাঝরাতে, প্ল্যাটফর্মে। আমরা তখন সত্যিই চোরের মত পালিয়ে দু-তিনটে লাইন পার হয়ে মালগাড়ির আড়ালে। ঘণ্টাখানেক অন্ধকার মালগাড়ির আড়ালে। আরো ঘন্টাখানেক মশার কামড় খাওয়ার পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে, অনেক রাতে একটা হাওড়ার ট্রেনে উঠলাম।

        ট্রেনের দোলায়, বসে বসেই খানিক ঘুমিয়ে যখন উঠলাম সকাল হয়ে গেছে। একটা স্টেশন পকেটে হাত দিলাম তিন টাকা চল্লিশ পয়সা পড়ে আছে। মানে আমি এখন রাজা। চা ওয়ালাকে ডাকলাম, একটা চা দাও তো ভাই। হঠাৎ পাশ থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে এল 'শ্যামল একাই খাবি চা। তাকিয়ে দেখি শুকনো মুখে নিতাই আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। মানে ওর পকেটে আছে মাত্র পঞ্চাশ পয়সা। ১১ নং এর বাস ভাড়া। তখন ওকে চা আর বিস্কিট খাওয়ালাম। শেষ পর্যন্ত এক সময় এসে পৌঁছালাম হাওড়া স্টেশন।

        সেই শুরু তারপর থেকে সারা ভারতের নানান জায়গায় বহুবার বেড়াতে গেছি বন্ধুবান্ধবের সাথে। জঙ্গল, সমুদ্র পাহাড় কিছুই বাদ নেই কিন্তু সেই সব স্মৃতি অনেক আবছা হয়ে আছ গেছে কিন্তু জীবনের প্রথম ঘুরতে যাওয়ার ঘটনার সব মুহূর্তগুলো যেন আমার স্মৃতির মনিকোঠায় সহজে রয়ে গেছে তারই এক ঝলক তোমাদের সাথে আমি ভাগ করে নিলাম।

–  সমাপ্ত