এসব কেমন লুঠ !

দীপক কুমার দাস 

    স্কুল-জীবনে পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ‘গুপ্তধন’ ; জেনেছিলাম, তাল-তাল সোনার আকরে বদ্ধ হয়ে মৃত্যুঞ্জয় বুঝেছিল এইই তার বধ্যভূমি। বর্তমানে সামাজিকতার উল্টোপথে ছুটে স্বার্থপরতার শিখরে পৌঁছে পিতা-মাতা’রা স্কুলে গমনরত তাদের শিশুদেরও, সামাজিকতাকে একরকম তাড়িয়ে, স্বার্থপরতার পাঠ শেখাতে ব্যস্ত হয়ে যান (তাদের শিশু যেন বন্ধুকে বই-খাতা না দেখায়, টিফিন যেন না দেয়, শেখা শিক্ষা যেন না জানায় - ইত্যাদি)। শৈশবেই শিশুর সারল্য, মনন লুঠ করছে তাদের অতিশিক্ষিত (?) পিতা-মাতারা'ই।

    কিশোর-মন বাজারে দেখছে ওজনে ভেজাল, দুধ ভেজাল, পচন-রোধী কেমিক্যালে মাখা ফল, মাছ, সব্জি প্রভৃতি -- সবই যেন অপ্রতিরোধ্য;  যদিও ক্যানসার সৃষ্টিতে সহায়ক। সে রাজপথে দেখছে যানবাহনের অনিয়মে, বেনিয়ম পুলিশি ঘুষ। তার কৈশোরেই ‘সুস্থ-নীতিবোধ' লুঠ করছে বাজার, রাজপথ।

    যৌবনে উপনীত হতেই তার কাছে খুলে গেল সন্ধ্যা-পাব, রাত-বার, অর্থ খরচের বা উপার্জনের জন্য এসকর্ট-সার্ভিস। তার যৌবন এভাবেই লুঠ করছে অতিশিক্ষিত(?) অনৈতিক সমাজের পিতা-মাতা’রাই।

    সংসার-জীবন তাই আজ ঠুনকো, ফোঁপড়া। সমাজ-জীবনও অহরহ তাণ্ডবের দোলায় ভাসমান। যেমন কিছু সৃষ্টি করতে কিছু ধবংস মানতে হয়, যেমন কিছু ধ্বংস করতে দৃশ্যমান সবকিছু উপড়ে ফেলতে হয়; তেমনই সমাজে সংস্কারের অবিরাম জোয়ার রাখতে অহরহ ধ্বংসের তাণ্ডব ‘গড়া-ভাঙা-গড়া-ভাঙা’বা “লেন-দেন-লেন-দেন'। নানা কিসিমের লেন-দেন ব্যালান্সে সংসার-জীবনই টালমাটাল। সমাজের অতিকুশলী সংস্কার-শৈলী, ব্যক্তির সংসার-সুখ লুঠে লিপ্ত।

    উচ্চ-ধাপে উচ্চ-চাপে অধিকতর শিক্ষা ও ক্ষমতা ব্যক্তিকে অশিক্ষিত / ছ্যাঁচড়া করে তোলে; অতিশিক্ষিত হওয়ার অনৈতিক দিক হলো এটাই। টেণ্ডারে 'তোলা' আদায়, মৃত রোগীকে জীবিত বলে জিইয়ে রাখা, দেশের সম্পদ ঘুরপথে বিক্রি / পাচার, সর্বত্তম মূল্য নিয়েও নিম্নমানের পরিষেবায় জনজীবনকে উপযুক্ত মানের / সময়ের সুবিধা না দেওয়া, এসবই অধিকতর শিক্ষার ও ক্ষমতার অনৈতিক দিক। অতিশিক্ষিতদের অনৈতিকতা অবশ্যই লুণ্ঠনকারী।

    পারিবারিক-জীবনে একটু আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকলেও মাঝ-জীবনে সেই ঘাটতি ঢাকার চেষ্টা ছিল। পথে-ঘাটে পরিচ্ছন্ন শরীরে পরিস্কার শার্ট-প্যান্ট, শাড়ি-ব্লাউজ পরেই চলাফেরার চল ছিল। এই প্রজন্ম ঘাড়ে-গলায়, সারা-বাহুতে, নাভি-পাশে, স্তন-পাশে নানা-কালির আঁকি-বুকি কেটে ১) শার্ট ও ছেঁড়া-ফাটা প্যান্ট বা ২) কাঁচুলি-মাপ (প্রায় চল্লিশ শতাংশ স্তন-উন্মুক্ত) ব্লাউজ সহ শাড়ি পরেই ‘উচ্চ-সামাজিকতা' ছড়াচ্ছে। ‘সভ্যতা-সংস্কৃতি’ লুঠ; মাত্রা বাড়িয়ে চলছে ছুট।

    আশায় থাকেন পিতা-মাতা; যত্নে-লালিত তাদের সন্তান বড় হয়ে,  পিতা-মাতা'কে আরও কিছু-বছর বাঁচতে সাহায্য করবে। পরিণত সময়ে সেই পিতা-মাতা যখন বোঝেন সন্তান তাদের ভার নেবে না, তখন সেই পিতা-মাতা'র মরমে-পালিত আশা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। জীবনের শ্রেষ্ঠ আশা মুহূর্ত-মধ্যে লুঠ হয়। আর স্বার্থপরতায় অবগাহন করে সন্তান প্রবেশ করে বধ্যভূমিতে।

    কেন এমন সব লুঠ ?

*=*=*=*