বাসন্তীক বাইক ভ্রমণ '২০২৪

সুনীল কর্মকার

(আমলাসোল গুড়গুড়িপাল - পাথরা) - ২৯ থেকে ৩১ মার্চ।

 

        দিনটা ছিল পঞ্চম দোল এবং গুড ফ্রাইডে, বাঘাযতীন মোড় থেকে সকাল ৬ টায় রওনা হয়ে টানা এসে, কোলাঘাটের সোনার বাংলায় থামলাম। আমাদের ব্রেকফাস্ট পয়েন্ট। প্রতিবারই এখানেই আমরা ব্রেকফাস্ট করি। ব্রেকফাস্ট শেষ করে আবার চলা। খড়গপুর থেকে চড়া রোদ পেলাম। বিশ্রামের জন্য দাঁড়ালাম নিমপুরা। কলাইকুন্ডার আগে এই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। চারিদিকে জঙ্গল, রাস্তাটা একটা পরিত্যক্ত মাইনসের দিকে গেছে, ফলে গাড়ি ঘোড়া কিছুই নেই।

        ভালো কথা, এই বাইক-রাইডটা ছিল আমাদের "Adventure Lover of Jadavpur University"-র উদ্যোগে। সদস্য ছিলাম ৪ জন, বিকাশ ভৌমিক, বিকাশ গুহ, অভিজিৎ দাস ও আমি। অভিজিতের ছিল ডিসকভার আর বাকি তিন জনেরই ইউনিকর্ন বাইক।

        লোধাশুলির জঙ্গলটা উপভোগ করার জন্য দাঁড়ালাম একটা নিরিবিলি নয়নজুলিতে, একটু ছায়ার আশায়। জাতীয় সড়ক ৬ - যেমন মসৃণ তেমনি চওড়া, এই রাস্তা চওড়া করতে লোধাশুলির প্রচুর গাছ কাটা গেছে। নিয়ম সমপরিমাণ গাছ অন্যত্র লাগালেই বন দপ্তর কাটতে দেয়। হয়তো বা লাগানো হয়েছে, কে জানে ! রোদ এতো চড়া যে পাখির কাকলিও শোনা যাচ্ছে না, কচি শাল পাতায় রোদ 'পরে হাওয়ার দুলুনি'তে চক্‌চক্‌ করছে। তাই আবার চলতে শুরু করে ঘাটশীলার আগে কাশীদা'তে ছাড়লাম হাইওয়ে।

        এরপর কখনও ঝাড়খন্ড কখনও বাংলার মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে একটা ছোট্ট জনপদে এসে চা খেলাম। এর পর শাল, পিয়াল ও আকাশমনি সোনাঝুড়ির ভিতর দিয়ে কালো পিচের রাস্তায় এঁকে বেঁকে চলতে চলতে একটা সাঁওতাল গ্রাম এল, নাম বরাঝুড়ি। দেখে দাঁড়াতেই হলো। ছিমছাম, টিপটাপ্‌ সুন্দর নিকানো উঠান, প্রত্যেক বাড়ির মাটির দেয়াল কি সুন্দর। মাটি আর মুর‍্যালে আঁকা রঙের বাহার, প্রত্যেক দেয়াল, যেন একেক'টা ছবির ক্যানভাস। ময়ূর, ফুল, লতাপাতা আঁকা দেয়াল, সবটাই নিজেদের হাতে করা। শুনেছি খাদান থেকে তুলে আনে (যারা আনে তাদের শুচি থাকতে হয়) রঙিন মাটি, সাথে বেলে মাটি, চিটে গুড়, আলকাতরা ভেষজ রঙ ইত্যাদি মিশিয়ে হয় রঙ, আলপনার আকর। এই সবটাই করে ঘরের মেয়েরা। এরা কেউ আর্ট স্কুলে শেখে না । অথচ কি আর্টিস্টিক সেন্স। প্রত্যেকটা দেয়াল দেখে আমাদের শহুরে চোখ আটকে যায়।

         এর পর রাস্তা একা হলো, ছোট ছোট টিলার মধ্যে দিয়ে পিচ-ওঠা পথ, নিঃসঙ্গ জঙ্গল, ইঞ্জিন বন্ধ করে চোখ বুঁজলাম। বিচিত্র পাখির ডাক, সাথে অচেনা পোকা ও ঝিঁঝিঁর ডাক। কয়েকটা ডিপ ব্রিদিং নিয়ে ভরে নিলাম প্রাণবায়ু। স্টার্ট দিলাম। আবার চলা শুরু, ভাঙাচোরা পথ ধরে এলাম আমলাসোল। গুগল্‌ পথ হারিয়েছে ! এবার কি হবে ! আমাদের ও সংশয়, বাকি রাস্তা কি বাইকের অনুকূল ! শেষে ফোনাফুনি করে জংলা পথে ধিতাং হোমস্টে পৌঁছলাম, তখন দুপুর ১:৩০ মি:। ওয়েলকাম ড্রিকংসের পর ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ খেলাম। এখানে সবকিছুই ইকো-ফ্রেন্ডলি। লাঞ্চের টেবিলেও তার ছোঁয়া পেলাম।

        বিশ্রাম মাত্র ৩০ মিনিট। বেরিয়ে পড়লাম আমঝর্নার খোঁজে। দূরে হঠাৎ ময়ূরের ঝাঁক দেখে দাঁড়ালাম। অনেক অপেক্ষা করেও ময়ূর আর পেলাম না। দেখলাম অরণ্যে আগুনের মালা, সাথে ধোঁয়ার কুন্ডলী। তাই নিয়েই চলল চর্চা। কে এবং কেন লাগাল আগুন, জ্যান্ত গাছগুলিও তো মরছে ! নির্জন পথে উত্তরহীন প্রশ্নগুলি ঘোরাফেরা করে আমাদের কাছেই ফিরে এলো আবার।

        বাইক ঘুরিয়ে এলাম কাঁকড়াঝোড়। সেই বনবাংলো, টিলার উপরে সেই সিকিউরিটি ষ্টেশন, সেই হাটতলা, সেই চায়ের দোকান। চা'য়ে চুমুক দিতেই কত শত পুরানো স্মৃতি ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মাহাতো'র মাটির ঘর, এখন হয়েছে মাহাতো লজ, মাটির'ই আছে, বটতলা'র সেই ঝোরাটা বাঁধানো, কেবলমাত্র বর্ষাকালেই জল বয়। আর গভীর ভাবে মনে পড়ে সেই মাতাল চাঁদনী রাতে মহুয়ার মৌতাত ও গান। শহুরে অনেক স্মৃতি হয়তো ভুলে যাবো কিন্তু এসব কি ভোলা যায়।

        সে বার ছিলাম বনবাংলোর উঠোনে তাঁবু করে। ভোলাভেদা থেকে হেঁটে এসেছিলাম। ফেরার পথে, ছিল চমক জাগানো স্মৃতি। বাংলো থেকে একটু ভোরেই হাঁটা শুরু করেছিলাম বাস ধরবো বলে। ঐ ভোরবেলাতেই হাতি'র তাড়া খেয়েছিলাম। হাতি দেখেছিল বরানগরের ছোটোন, ওর চেঁচামেচি আর দৌড় দেখে আমরাও মোরেম রাস্তা দিয়ে স্যাক পিঠে করে দৌড়লাম। প্রাণভয়ে সে কি দৌড় ! প্রথম বারের স্মৃতি, তার প্রভাব একদম আলাদা।

        ধিতাং থেকে ফেরার পথে পশ্চিমে পাহাড়ী টিলার পিছনে সূর্যাস্ত। আহা কি সুন্দর সে গোধূলির স্বর্নরাগ ! আমরা তো, বাইক নিয়ে ধানক্ষেতে-ই নেমে গেলাম। আমলাসোল ঢোকার মুখে জঙ্গলে'র সেই আগুন-মালা, অন্ধকারের মধ্যে ঐ আগুন মালার অনুভূতি আরো গভীর রেখাপাত করলো। পাহাড়ি ঢালে আলোর মালা সে এক অসহায় অবাক দর্শন। হয়তো এখানের সমাজজীবনে এটাই রীতি। শুকনো পাতা পুড়ে সার হবে, বর্ষায় নতুন গাছ হবে, আরো সতেজ ও ঘন হবে জঙ্গল। রাতের ধিতাং হোম-স্টে ভিন্ন রুপে দেখা দিল। অন্ধকার, ঝিঁঝিঁর ডাক, জোনাকি'র টুনি লাইট। দেখতে দেখতেই এল ডিনারের ডাক।

        পরের দিন সকালে আমলাসোল গ্রাম'টা ঘুরে দেখলাম। সকালের সোনালী রোদে ময়ূর আর মহুয়া ফুলে আমলাসোল আদিবাসী গ্রামখানি মায়াবী লাগলো। প্রত্যেকটা মহুয়া গাছের তলা নিকানো, রসে টইটম্বুর মহুয়া ফুল পরে আছে। স্কুল বাড়ির চাল মহুয়া ফুলে ছেয়ে গেছে, উঠোন তো আল্পনায় আঁকা।

        ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম কেতকি লেকের উদ্দেশ্যে। এবার বাইক নিয়ে লেকের দক্ষিণ পাড়ে চলে গেলাম। লেকের জল আগের থেকে অনেক কম। এই সুন্দর জলাশয়টি কাঁকড়াঝোরের সবুজ ফুসফুস। লম্বা এক গরুর পাল লেকের পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাড়ি দিল, সাথে রাখাল ছিল। আমরা পিয়াল গাছের ছায়ায় বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করলাম। এলাকাটি খুবই দৃষ্টিনন্দন।

        কেতকি লেকে খানিক সময় কাটিয়ে বাইক ঘোরালাম ওদোলচুয়া গ্রামের দিকে। টার্গেট, খাদাং ডুংড়ি। গত বার খুঁজে পাইনি, এবার তাই গাইড নিলাম। খানিক গিয়ে, বাইক চালানো মুশকিল হল, বাইক রেখে হাঁটা ধরলাম। বিকাশ ভৌমিক ধাংঙ্গিচুয়া গ্রামের প্রান্তেই গাছের ছায়ায় বসে রইল। ওর হাঁটুর সমস্যা। প্রথমে খাদানে পরে টিলার উপরে উঠলাম। বিচিত্র রঙের পাথর তাই এর আর এক নাম রঙিন পাহাড়। গাইড বললো, একটা কোম্পানি এই পাথর কাটিয়ে কলকাতায় নিয়ে যেত। প্রসাশনিক চাপে এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এই রঙিন পাহাড়ের উপর থেকে চারদিকের দৃশ্যও রঙিন লাগলো।

       ধাংঙ্গিচুয়া ছেড়ে বিনপুর হয়ে এবার যাবো গুড়গুড়িপাল। অনেকটাই অচেনা পথ। হাইওয়ের পর, যেখানে পিচের রাস্তা শেষ, সেখান থেকে শুরু হয়ে, লাল মাটির পথ, খানিক গিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছে। ডান দিকে একটা পথ গেছে গ্রামের দিকে। সেই পথ নিয়ে গেল আর এক জঙ্গলের প্রান্তে। এখানেই জঙ্গল-ক্যাম্প। সুসজ্জিত ক্যাম্প সাইট, ৩-সারি টেন্ট। আমাদেরগুলোতে ভালই গরম, ডাইরেক্ট রোদ পরছে, গাছের ছায়া পেতে অনেক দেরি আছে। ওয়েলকাম ড্রিংকসের সাথে একটি তুলোট কাগজের পেন, ভেষজ পেষ্ট, কাঠের টুথব্রাশ ও একটি হ্যান্ডলুম গামছা, এরই নাম ইকো-টুরিজম। ক্যাম্পের তিন দিকেই শাল জঙ্গলে ঘেরা। হাতী প্রায়ই আসে, তাই ইলেকট্রিক ফেন্সিং।

        লাঞ্চ সেরে ঐ ফেন্সিং এর ধারে শালের লম্বা ছায়ার নিচে খাটিয়া পেতে ভাত ঘুম। ছোট্ট বিশ্রাম। সূর্য অস্ত যাবার আগেই গেলাম কংসাবতীর পাড়। বাঁশের ব্রিজে টোল আছে। তাই এপার থেকেই সূর্য ডোবা বেশ উপভোগ করলাম। সত্যি পারের কড়ি জোগাবার মত কংসাবতী'র পাড়। শান্তিময় পরিবেশে মনটা থিতু হয়ে এল। ক্যাম্পে ফিরলাম। একটা ভ্যাপসা গরম, গাছের পাতা একটুও দুলছে না। ইভিনিং স্ন্যাক্স দিল, মশা ও গরমের দাপটে ঠিক উপভোগ করা গেল না। ডাইনিং হলটা একটা পিরামিড টেন্ট। রাতের ডিনার সেখানেই সারলাম। ক্যম্পের বাইরেটা নিকষ অন্ধকার, বুনো শব্দ ও গন্ধে মৃদু রহস্যময়। কেয়ার টেকার বারণ করল ক্যাম্পের বাইরে যেতে। খানিক পায়চারি করে তাঁবুতে ঢুকে ফ্যান চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

        সুপ্রভাত গুড়গুড়িপাল ! ব্রেকফাষ্টের পর বেড়িয়ে পড়লাম। ব্রেকফাস্ট টেবিলে আলাপ হলো পলাশ চ্যাটার্জী নামে আর এক বাইকারের সাথে। বেশ নিবিড় পরিচয় হলো কারন উনিও দীর্ঘকাল ধরে বাইক-রাইড করেন। বরাহনগর বনহুগলীর বাসিন্দা। এক সাথে রাইড করার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম।

        সব বাইক স্টার্ট দিলাম, পলাশবাবু'র থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা করলাম পাথরা'র উদ্দেশ্যে। পাথরা, পুরাতত্ত্ব ঘেরা মন্দিরময় গ্রাম। সবই অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালের। জনশ্রুতি আছে অনেক অকথিত কাহিনী। খুঁজে বার করেছেন মহান ইয়াসিন পাঠান। সাহায্য পেয়েছে আই.আই.টি খড়গপুরের থেকেও। বর্তমানে অক্ষত ৩৪টি মন্দির আছে। বহু মূর্তি ও মন্দির উদ্ধার করেছেন উনি। বিশেষ করে, বৌদ্ধ-হিন্দু ধর্ম সংমিশ্রণে তৈরী একটি মূর্তি। বর্তমানে সেটি আশুতোষ মিউজিয়ামে রাখা আছে। ওঁর নিরলস প্রচেষ্টায় এটি এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া টেকওভার করেছে। যদিও বাকি আছে এখনো অনেক খননকার্য। আজও এর ইঁট, কাঠ, কড়িবর্গা'র গা'য় কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে অনেক অশ্রুত কাহিনী। তারই খোঁজে আমরা ঘুরে বেড়ালাম মন্দির থেকে মন্দিরে। তার পর বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হলাম কংসাবতী নদী, সেও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কংসাবতীর সেই খেয়া ঘাট থেকে ভাঙাচোরা রাস্তা কাটিয়ে ডেবরায় NH 6-এ এসে পরলাম। চায়ের বিরতিতে চললো পরের রাইডের চর্চা। 

== ***==

প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য :-

আমাদের পথের দূরত্ব বাড়ি থেকে বাড়ি ৬৯৯ কিমি।

ধিতাং হোমষ্টে :

Rate  @ Rs. 1650/- Per Head without Food.

        @ Rs. 1250/- Per Head with Food.

To Contact : Manager – Mobile - 70012 99453

Mobile : 98366 90754 / 99037 69626

Gurguripal Nature Camp :

Tent with Private Washroom: Rs.1500/-,

Rs.1650/- with Fooding & Lodging Per Head.

Tent with Common Washroom: Rs.1350/- &

Rs.1500/- with Fooding & Lodging Per Head.

Mobile : 96741 23449 (Swapan Sasmal)

আমাদের রাইডের ছবি ও ভিডিও ২-টা পার্টে আছে। লিংক নিচে দিলাম।

১.  

২.