আমাদের কথা  

 চলতে চলতে

       আমাদের প্রিয় স্কুল বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম থেকে স্কুল জীবন শেষ করে ১৯৭৩ সালে যখন নতুন জগতে পা রাখলাম, পেছনে ফেলে এলাম আমাদের শৈশব, কৈশোর, অনেকগুলো বছরের 'স্মৃতি’, শিক্ষকদের স্নেহ ও শাসন এবং ক্লাসমেটদের বন্ধুত্বের নিবিড় বন্ধন।  উচ্চতর শিক্ষার তাগিদে এবার আমরা আলাদা আলাদা পথে যাত্রা শুরু করলাম।  আমাদের মধ্যে কয়েকজন আবার কলকাতা থেকে অনেক দূরের কলেজে ভর্তি হলাম।  তখন থেকেই আমাদের যোগাযোগ অনেক ক্ষীণ হতে শুরু করল।  তারপর আরো কত বছর পার হয়ে গেল। শিক্ষাজীবন শেষ করে আমরা কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম। নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেলাম আমরা। কেউ কেউ আবার দেশের বাইরে। এইভাবে চলতে চলতে আমরা একসময় কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখলাম কয়েকজন ছাড়া বেশীর ভাগ বন্ধুর সাথেই কোন যোগাযোগ নেই। অনেক বন্ধুর মুখ ঝাপসা হয়ে গেছে। কিছু বন্ধু আবার চলে গেছে না ফেরার দেশে।

        জীবনের এইরকম এক সন্ধিক্ষণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের এক সূত্রে গাঁথার কঠিন ও প্রযোজনীয় কাজটি করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা নেয় সুনীল। তার সঙ্গে অবশ্যই অভিজিৎ ও রূপকুমারের সহযোগীতার কথা বলতে হবে। যাই হোক এদের ঐকান্তিক চেষ্টায় আমাদের ব্যাচের প্রায় ২৫/৩০ জনকে এক মঞ্চে আনা গেল। আমাদের ব্যাচের নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি হোল ২০১৮ সালে। এর পর আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ শুরু করলাম। তবে প্রথম অনেক বন্ধুকে একসঙ্গে পাওয়া গেল রামকৃষ্ণ চক্রবর্তির দর্জিপাড়ার খালি ফ্ল্যাটে। সেদিন মোমবাতি জ্বালিয়ে, সমবেত কণ্ঠে "পুরানো সেই দিনের কথা" গান গেয়ে আমাদের বন্ধুত্বের পুনর্নবীকরণ করা হোল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের ব্যবধানে। এরপর স্মৃতিচারণ, গান, আড্ডা, হাসি, খুনসুটি আর খাওয়া দাওয়ায় আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকল সেই সন্ধ্যা। আজ আমাদের মধ্যে রামু (রামকৃষ্ণ) আর নেই। কিন্তু আমাদের নতুন যাত্রার সূচনা ওর হাত ধরেই হয়ে গেল।

    এরপর কয়েকবার আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হল না মহামারী ‘করোনা’র সৌজন্যে। ২০২০ সালটা আমরা প্রায় ঘরে বসেই কাটালাম। পরের বছরের প্রথম ভাগে করোনার তীব্রতা কমে আসাতে আমরা আবার নতুন করে শুরু করলাম। এইবার শ্যামলের (চক্রবর্তী) পরিচিত এক সহৃদয় ব্যক্তির বৈঠকখানায়, আবার মাঝে মাঝে শিবনাথের সাউথ সিঁথির পুরনো বাড়িতে। ২০২১ সালটা আমাদের ব্যাচের জন্য খুব উল্লেখযোগ্য ও কর্মব্যস্ত বছর। শুরুটা হোল বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় 'ইয়াস' দিয়ে। ইয়াস তার ধ্বংসলীলা চালালো বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে। হাজার হাজার মানুষ ও পশুর জীবন বিপর্যস্ত হল এই ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডবে। সেই সময় এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য কিছু করার জন্য ভেতর থেকে খুব তাগিদ অনুভব করলাম। আমি প্রস্তাবটা দিতেই সুনীল, গৌতম, অভিজিৎ ও বাকি বন্ধুরা আন্তরিক ভাবে সমর্থন করল। ঠিক হোল আমাদের গ্রুপের ২০/২৫ জনের আর্থিক সহায়তায় সুন্দরবনের কিছু পীড়িত মানুষের হাতে নিজেরা কিছু খাদ্যসামগ্রী তুলে দেব। বন্যাপীড়িত গ্রাম নির্বাচন ও লঞ্চে যাতায়াতের বন্দোবস্ত করল দীপক। সকলের কাছ থেকে অর্থসাহায্য এল স্বতস্ফূর্তভাবে। প্রবাসী বন্ধু অপূর্ব, শ্যামা, দেবাশীষ সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। সবার সহযোগীতায় ত্রাণসামগ্রী কিনে নিজেরা প্যাকিং করে ৩০শে জুন ২০২১ সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমরা নিজেরা প্রায় ৩০০ পরিবারের হাতে তুলে দিলাম অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা ও শুভেচ্ছার বিনিময়ে। আমাদের সীমিত সামর্থে কিছু অসহায় মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পেরে সবাই এত আনন্দ পেলাম, আপ্লুত হলাম যে এই কাজ টা আমাদের ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। আমরা এই বয়সেও যে কিছু করতে পারি মানুষের জন্য, এই বিশ্বাসটা আমাদের মনে জন্ম নিল।

    এরপর আমরা এই রকম সামাজিক কাজে নিজেদের আর একটু এগিয়ে দিলাম। শ্রী সত্য সাঁই আরোগ্য বাহিনী কলকাতা ও আমাদের ব্যাচের সদস্যদের যৌথ উদ্যোগে ২২শে আগস্ট ২০২১ এ নবোদয় ক্লাব, মতিলাল মল্লিক লেনে এবং ২৭শে অক্টোবর ২১এ যতীন্দ্র বিদ্যাপীঠ, নিরঞ্জন সেন নগরে দুটি দাতব্য চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হল। এই কাজে যুক্ত করার পেছনে অভিজিৎ এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমাদের সকলের সক্রিয় সহযোগিতায় দু'টি শিবিরই সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত মানুষের অকুণ্ঠ প্রশংসা ও শুভেচ্ছা আমাদের পরম প্রাপ্তি। প্রতিটি শিবিরেই শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসকদের পরামর্শ, সুগার ও প্রেশারের জন্য রক্তপরীক্ষা, প্রেশার মাপা ও ওষুধ নেওয়ার সুযোগ পান।

    এরপর আবার ছন্দপতন। আমাদের দুই বন্ধু সুজিত সাহা ও শৈলেশ্বর নন্দীর অকাল প্রয়ান আমাদের বিহ্বল করে দিল। তাদের শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা সেই শোক ভাগ করে নিলাম। ৫ই ডিসেম্বর ২০২১ দুই বন্ধুর জন্য শোকসভা আয়োজিত হোল প্রয়াত বন্ধুদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে।

    এই ভাবেই চলতে চলতে আমাদের নিয়মিত বৈঠকের জন্য একটা পাকাপাকি ঠিকানা পেয়ে গেলাম। দীপঙ্কর আর ওর পরিবারের সৌজন্যে ওদের নবপল্লী’র খালি ফ্ল্যাটে নিয়মিত আমাদের বৈঠক শুরু হল। দীপঙ্কর ও ওর স্ত্রী সঙ্গীতার কাছে এই সহযোগীতা, সৌজন্য, আন্তরিকতায় আমরা চিরকৃতজ্ঞ। 

     আমাদের এর পরবর্তী কর্মকান্ড আমাদের শিক্ষকদের সম্বর্ধনা জানানো। আমাদের স্কুলজীবনে যাঁরা শিক্ষক ছিলেন তাঁদের খোঁজখবর করে তিন জনকে পাওয়া গেল। শ্রীযুক্ত দুলাল চন্দ্র দাস, শ্রীযুক্ত সুবোধ দাস এবং শ্রীযুক্ত দ্বারিকানাথ চট্টোপাধ্যায় এই তিন জনকে আমরা সম্বর্ধনা জানালাম ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২-এ শ্যামলের (চক্রবর্তি) এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফ্ল্যাটে। শ্রদ্ধায় স্মৃতিকথায়, সঙ্গীতে এবং প্রিয় শিক্ষকদের মূল্যবান ভাষণে এক স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী হলাম আমরা। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য সুবোধদা সেদিন আসতে পারেন নি। ওই অনুষ্ঠানের পরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে সুনীল আর বিপদ ভঞ্জন তাঁর হাতে মানপত্র ও স্মারক তুলে দিয়ে এসেছিল। এর কয়েকদিন পরেই সুবোধদা চিরবিদায় নেন। এই প্রসঙ্গে বলি, শ্যামলে’র বন্ধু ও ওঁর স্ত্রী’র অকৃত্রিম সহযোগীতা, উদারতা ও আন্তরিতার কথা কোনদিন ভুলব না। 

২০২৪ সাল পর্যন্ত আমরা যত গেট-টুগেদার করেছি, যত পিকনিক করেছি, আমাদের বেটার-হাফদের বাদ দিয়েই করেছি। এর পেছনে আমাদের কোনো বিশেষ অভিসন্ধি ছিল না। আসলে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা কখনও ভাবিই নি। সঙ্গত কারণেই মহিলা মহলের তাই একটু অভিমান, অনুযোগ ছিল। তাই ২০২৪ এর অক্টোবরে আমরা সস্ত্রীক গেট-টুগেদার করলাম নিয়োগীপাড়ার একটি অনুষ্ঠান বাড়িতে। গান, আবৃত্তি, আড্ডা, নৈশভোজ সব কিছু নিয়ে একটা জমজমাট আনন্দময় সন্ধ্যা উপভোগ করলাম সবাই। অনুষ্ঠান বাড়ির আয়োজন ও খাবারের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সামাল দিল দুই শ্যামল (রায়-চৌধুরী ও চক্রবর্তী)। এরপর ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারী মাসে পিকনিক করলাম সবাই মিলে (পরিবার সহ) খড়দহ ‘ভাষা উদ্যানে’।

     এ সবের মধ্যেই কিছু মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে গেছে। আমাদের তিন বন্ধু দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য, রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী এবং দেবনাথ মুখার্জি চিরবিদায় নিয়েছে। কোন কোন বন্ধু তাদের অত্যন্ত প্রিয়জনকে হারিয়েছে। সেই সব প্রসঙ্গ তুলে সবার মন ভারাক্রান্ত করতে চাই না। জীবনের সব ওঠাপড়া, ঘাত-প্রতিঘাত, অসুখ- যন্ত্রনা সবকিছু মেনে নিতেই হয়। জীবন কিন্তু চলতে থাকে তার আপন গতিতে।

    আমরাও তাই চলছি সবাই মিলে। ভাবছি নতুন কিছু করার। এই ভাবনা থেকেই এই ই-ম্যাগাজিনের জন্ম। প্রথমে একটু সংকোচ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবাই যেভাবে এতে অংশগ্রহন করেছে তা অভাবনীয়। এমনকি আমেরিকাপ্রবাসী বন্ধু অপূর্বও লেখা পাঠিয়েছে। তবে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল আমাদের অনেকের গৃহিনীও তাদের লেখা কবিতা, স্মৃতিচারণা ও অনুভূতির গল্পে আমাদের এই পত্রিকা সমৃদ্ধ করেছেন। আর এইসব লেখা সংকলন ও প্রকাশ করে আমাদের প্রথম ম্যাগাজিনের রূপদান করার মহান দায়িত্ব পালন করেছে গৌতম, যার জন্য অনেক প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানাই ওকে সবার মুখপাত্র হয়ে। আমাদের এই পরিবারের সকল সদস্য সদস্যাদের জানাই ইংরাজী নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। নতুন বছরেও যেন আমরা সবাই আমাদের এই যাত্রাপথে একসঙ্গে চলে আমাদের এই যাত্রা উপভোগ্য, সার্থক ও আনন্দময় করে তুলতে পারি। আমাদের চলার পথ এবং পথ চলা যেন শেষ না হয়। চরৈবেতি।

                                                      অমলেশ ভট্টাচার্য্য